সড়কে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ১২:৩১ এএম
সড়কে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য

সড়কে অটোরিকশার নৈরাজ্য এখন রাজধানীসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়কগুলোয়ও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তিন চাকার এই বাহনের দাপট।

বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও বেপরোয়া গতি যাতায়াত ব্যবস্থাকে চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। হাইওয়ে কিংবা ব্যস্ততম মহাসড়ক কোথাও বাদ নেই এদের আধিপত্য। লাইসেন্সবিহীন চালক, যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ট্রাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতায় প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা।

অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ও স্থানীয় চাঁদাবাজদের প্রশ্রয়ে এসব অবৈধ বাহন সড়ক দখল করে রাখছে, যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। প্রশাসন মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে কয়েকদিন পরই ফিরে আসে সেই চিরচেনা বিশৃঙ্খলা।

একদিকেযাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অন্যদিকে সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা সব মিলিয়ে অটোরিকশার এই লাগামহীন চলাচল এখন রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। একটি আধুনিক ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সড়কের এই নৈরাজ্য নিরসন এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

সড়কে বিশৃঙ্খলার চালচিত্র : লাইসেন্সহীন ‘রাস্তার রাজা’

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক এসেছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও গ্যারেজ মালিকরা মাসিক বা দৈনিক ভাড়ার চুক্তিতে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন এই দ্রুতগতির বাহন।

দুর্ঘটনার ঝুঁকি: চালকদের অদক্ষতার কারণে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও তেজগাঁওয়ের মতো ব্যস্ত এলাকায় প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। গতির কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পথচারী আহতের ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক।

যানজট ও অব্যবস্থাপনা: প্রধান সড়কে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও পুলিশের একাংশের যোগসাজশে অলিগলি ছাড়িয়ে রিকশাগুলো এখন মহাসড়কে উঠে আসছে। ফলে যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় আঘাত : ১ হাজার মেগাওয়াটের হিসাব : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ১৩ হাজার রিকশার গ্যারেজ। এসব গ্যারেজে ৬৫ হাজারেরও বেশি চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। অবৈধ সংযোগের মহোৎসব : ডিপিডিসির হিসাব মতে, বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৪৬টি। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ চার্জিং পয়েন্ট চলছে আবাসিক মিটার অথবা সরাসরি মেইন লাইন থেকে চুরি করা বিদ্যুতে। রাজস্ব ক্ষতি: গ্যারেজ মালিকরা চালকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ দৈনিক ৭০ থেকে ১৫০ টাকা আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে তার কানাকড়িও জমা পড়ছে না। উল্টো লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

গ্যারেজ ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য : ঢাকার মানিকনগর, মুগদা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং তেজগাঁও এলাকায় এই সিন্ডিকেটের মূল ঘাঁটি। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও অসাধু ব্যবসায়ীরা এই রিকশা বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন। একেকটি রিকশা থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা পর্যন্ত মালিকানা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এর ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ এই পেশায় জড়িয়ে পড়লেও মূল লভ্যাংশ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের হাতে।

সমাধানের খোঁজে সরকার— ১৪ মে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক :

বিদ্যমান সংকট নিরসনে আগামী ১৪ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, ডিএমপি এবং ট্রাফিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বক্তব্য: প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, যানজট নিরসনে তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে চান এবং প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। বিশেষজ্ঞ মতামত: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সতর্ক করেছেন যে, এখন এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে হঠাৎ উচ্ছেদ করতে গেলে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই উচ্ছেদের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান বা শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরবতা ও দায় : বিদ্যুৎ চুরির বিষয়ে ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের নীরবতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু লাইনম্যান ও কর্মকর্তার যোগসাজশেই বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ চুরি চলছে। ফলে কোনো দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না।

পরিশেষে বলা যায়, সড়কের শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোরিকশার এই লাগামহীন নৈরাজ্য বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। তবে কেবল উচ্ছেদ বা কড়াকড়ি আরোপই যথেষ্ট নয়; বরং বিপুল সংখ্যক চালকের কর্মসংস্থান এবং স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় রেখে একটি সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

ব্যাটারিচালিত রিকশার কারিগরি মান নিয়ন্ত্রণ, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক বা হাইওয়েতে এদের চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট ফিডার রোডে চলাচলের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট নির্মূল করা সম্ভব হলে সড়কের বিশৃঙ্খলা অনেকাংশেই কমে আসবে।

আধুনিক ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রশাসন, চালক এবং সাধারণ যাত্রীসেবার সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে সড়কের এই নৈরাজ্য দূর করে একটি স্বস্তিদায়ক যাতায়াত পরিবেশ নিশ্চিত করতে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হোক বা দৈনন্দিন চলাচল, সড়কের প্রতিটি জীবন যেন নিরাপদ থাকে এটাই হোক আগামীর অঙ্গীকার।