- ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে সাত গুণেরও বেশি
- আগামী অর্থবছরে লোকসান ৬৫ হাজার কোটি টাকা
- বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পিডিবির ‘স্ল্যাব’ কৌশল
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে গৃহীত অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও দায়মুক্তি আইনের আড়ালে করা অস্বচ্ছ চুক্তির চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে এই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে সাত গুণেরও বেশি বা প্রায় ৬৩৩ শতাংশ।
পিডিবির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা, সেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উচ্চ হারের ক্যাপাসিটি চার্জ, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই এই খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাত বিশেষজ্ঞরা।
ভর্তুকির উল্লম্ফন : বিদ্যুৎ বিভাগের সামপ্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়— ২০২০-২১ অর্থবছর: ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছর: ১১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছর: ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ (প্রাক্কলিত): ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ (সম্ভাব্য): ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে এই এক বছরের সম্ভাব্য ভর্তুকির অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দেড় বছরের স্বাস্থ্য বাজেট অথবা আড়াই বছরের কৃষি বাজেটের সংস্থান করা সম্ভব ছিল। জনগণের করের টাকা এখন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় না হয়ে গিলে খাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ।
সংকটের নেপথ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভুল নীতি : বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক অবস্থার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে— ১. উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ: বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে চুক্তি অনুযায়ী যে ভাড়ার টাকা দিতে হয়, তাকেই বলা হয় ক্যাপাসিটি চার্জ। মোট ভর্তুকির প্রায় ৮১ শতাংশই চলে যাচ্ছে এই খাতে। বিগত সরকারের আমলে দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনে করা এসব চুক্তির কারণে গত কয়েক বছরে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ অপচয় হয়েছে।
২. আমদানি নির্ভরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট: নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনে ব্যর্থ হয়ে সরকার তরল জ্বালানি (ডিজেল, এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। সমপ্রতি ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
৩. আদানি ও ভারত-নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি: আদানিসহ বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে করা অসম চুক্তির কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, যা পিডিবির লোকসানকে আরও উসকে দিচ্ছে। বর্তমানে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২.৩৫ টাকায় কিনে মাত্র ৬.৬৩ টাকায় বিক্রি করছে।
জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও আশু সংস্কার : গত ২৫ জানুয়ারি ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর আওতায় হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে যেখানে পিডিবির লোকসান ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা ১০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। কেবল পিডিবিকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন- এমন আশঙ্কাজনক তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব খনির গ্যাস ব্যবহারের চেয়ে আমদানিকৃত জ্বালানি ও দায়মুক্তি আইনের আড়ালে ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পিডিবির ‘স্ল্যাব’ কৌশল : দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন অস্থিরতার পূর্বাভাস দিচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কেবল সরাসরি ইউনিট প্রতি দাম বাড়ানোই নয়, বরং আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিলিং ধাপ বা ‘স্ল্যাব’ পরিবর্তনের এক নতুন কৌশলী প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের একটি বিশাল অংশের গ্রাহক, বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি, তাদের দীর্ঘদিনের সুলভ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাবেন। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের অজুহাতে পিডিবি এখন বছরে দুবার দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটতে চাইছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১. স্ল্যাব পরিবর্তনের নতুন মারপ্যাঁচ : বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ বিলিংয়ের একাধিক ধাপ প্রচলিত আছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন গ্রাহক ২০০ ইউনিট ব্যবহার করলে প্রথম ৭৫ ইউনিটের দাম দেন কম হারে (৫.২৬ টাকা), আর বাকি ১২৫ ইউনিটের দাম দেন দ্বিতীয় ধাপের হারে। কিন্তু পিডিবির নতুন প্রস্তাব বলছে, কেউ যদি ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তবে তিনি আর প্রথম ধাপের স্বল্প মূল্যের সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ, ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীকে পুরো ২০০ ইউনিটের বিলই দিতে হবে দ্বিতীয় ধাপের উচ্চমূল্যে।
২. গ্রাহকের পকেটে কতটা চাপ পড়বে : পিডিবির প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন ও ইউনিট প্রতি দাম বৃদ্ধির ফলে একজন সাধারণ গ্রাহকের বিলের বোঝা কতটা বাড়বে, তার একটি চিত্র দেয়া হলো—
বিষয় বর্তমান নিয়ম পিডিবির নতুন প্রস্তাব : ২০০ ইউনিটের হিসাব- প্রথম ৭৫ ইউনিট (৫.২৬ টাকা) + ১২৫ ইউনিট (৭.২০ টাকা) পুরো ২০০ ইউনিট (৮.২০ টাকা) মোট বিল (ভ্যাট ছাড়া) ১,২৯৪.৫০ টাকা ১,৬৪০.০০ টাকা; নিট বৃদ্ধি - ৩৪৫.৫০ টাকা।
শুধুমাত্র স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণেই গ্রাহককে বাড়তি ১৪৫.৫০ টাকা গুণতে হবে। এর ওপর পিডিবি দ্বিতীয় ধাপের ইউনিট প্রতি দাম ৭.২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.২০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
৩. লক্ষ্যবস্তু যখন নিম্নমধ্যবিত্ত : পিডিবির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক সরাসরি বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যাদের মাসিক ব্যবহার ৭৫ থেকে ২০০ ইউনিটের মধ্যে। সাধারণত একটি পরিবারে কয়েকটি বাতি, ফ্যান, টিভি ও একটি ফ্রিজ চললে ব্যবহার অনায়াসেই এই ধাপে পৌঁছে যায়। পিডিবি বলছে, এই কৌশলে তারা বছরে অতিরিক্ত ২,৬৫৭ কোটি টাকা আয় করতে পারবে।
পিডিবি ও বিইআরসির অবস্থান : পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের মতে, গত কয়েক বছরে ডলারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে জ্বালানি কেনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। ঘাটতি মেটাতে আবাসিকের স্ল্যাব পরিবর্তন ও দাম সমন্বয় ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, তারা ২০ ও ২১ মে এই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করবে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘ধাপগুলো করা হয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষকে সুবিধা দিতে। আমরা কারিগরি কমিটির রিপোর্ট এবং শুনানির মতামত যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’
স্বয়ংক্রিয় ও নিয়মিত দাম সমন্বয় : পিডিবি কেবল এখনকার জন্য দাম বাড়াতে চায় না, বরং তারা ‘মাল্টিইয়ার ট্যারিফ’ বা কয়েক বছরের জন্য আগাম দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা কমলে যেন দেশেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের দাম প্রতি ছয় মাস অন্তর সমন্বয় করা যায়, সেই সূত্রও তারা কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে।
সমালোচনা ও বিশেষজ্ঞ মতামত : বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা এই প্রস্তাবকে ‘লুণ্ঠনমূলক’ এবং ‘জনবিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘পিডিবি উৎপাদন খরচ কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে কেবল সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপাচ্ছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা চুক্তিগুলোর কারণে যে বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়া গুণতে হচ্ছে, সরকার তা বন্ধ করছে না। স্ল্যাব পরিবর্তনের এই প্রস্তাব মূলত নিম্নমধ্যবিত্তের পকেট কাটার কৌশল।’
উল্লেখ্য, জাতীয় কমিটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সৌরবিদ্যুৎ থেকে শুরু করে ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্রে সরকার বাজারের তুলনায় ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। এই অযৌক্তিক খরচ না কমিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোকে বড় ধরনের অন্যায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ খাত এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার নাম। বছরের পর বছর ধরে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির যে বোঝা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এবং শিল্পোৎপাদনে। অন্যদিকে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে বাজেট ঘাটতি সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা অসম চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। দ্রুত আমূল সংস্কার করা না হলে এই ভর্তুকির পাহাড় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন