রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা রিঙ্কু দাস প্রতিদিনের মতো অফিসে যাওয়ার জন্য ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসে উঠেছেন। কিন্তু বাসের সিটে বসা মাত্রই তার গা গুলিয়ে ওঠে। সিটের সামনের কাভারে জমে আছে ধুলোর পুরু স্তর, আর বাতাসজুড়ে এক উৎকট ভ্যাপসা গন্ধ। রিঙ্কুর মতো প্রতিদিন ঢাকার সড়কে চলাচলকারী প্রায় ২৫ লাখ মানুষের গল্পটা একই রকম। যাতায়াতের প্রয়োজনে মানুষ বাধ্য হয়ে এসব অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর বাহনে উঠছে, আর ঘরে ফিরছে মরণব্যাধি জীবাণু নিয়ে। বর্তমান ঢাকার গণপরিবহনগুলো এখন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং রোগ-জীবাণু ছড়ানোর একটি শক্তিশালী কারখানায় পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মতিঝিল ও মোহাম্মদপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাসের ভেতরের অবস্থা শোচনীয়। জীবাণুর স্তর: বছরের পর বছর বাসের সিট কাভার বা হ্যান্ডেল পরিষ্কার করা হয় না। ফলে ঘাম, ধুলো এবং আর্দ্রতা মিলে হ্যান্ডেলগুলো কালচে ও আঠালো হয়ে গেছে।
বমি ও পানের পিক: অনেক বাসের কোণায় কোণায় যাত্রীদের থুতু, পানের পিক এবং শুকনো বমির দাগ লেগে আছে। তীব্র গরমে এসব দাগ থেকে নির্গত হচ্ছে অসহনীয় দুর্গন্ধ। ভাঙা ফিটনেস: সিটের স্পঞ্জ বেরিয়ে যাওয়া, জানালায় ভাঙা কাচ এবং লোহার তীক্ষ্ণ অংশ বের হয়ে থাকা যেন নিয়মিত চিত্র। এতে যাত্রীদের পোশাক যেমন ছিঁড়ছে, তেমনি জখম হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
পোশাককর্মী সুলতানা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘সিটে বসার আগে বাড়তি কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হয়, তবুও সারা দিন শরীরে এক ধরনের উৎকট গন্ধ লেগে থাকে। বাসে কেউ কাশলে বুক কাঁপে, যদি যক্ষ্মা বা অন্য কোনো ছোঁয়াচে রোগ হয়ে যায়!’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, গণপরিবহনের এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বড় ধরনের মহামারীর কারণ হতে পারে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন: ‘বাসের হ্যান্ডেল বা সিট থেকে হেপাটাইটিস, স্ক্যাবিস (চুলকানি), ফাঙ্গাল ইনফেকশন এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা খুব দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে যক্ষ্মার মতো বায়ুবাহিত রোগ এই বদ্ধ ও নোংরা পরিবেশে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি এখন জীবন-মরণের প্রশ্ন।’
যাত্রীদের অভিযোগের বিপরীতে পরিবহনের চালক ও সহকারীদের মধ্যে চরম উদাসীনতা দেখা গেছে। রাইদা পরিবহনের চালক তোফাজ্জল বলেন, ‘ভোর থেকে রাত পর্যন্ত গাড়ি চালাই, ধোয়ার সময় কোথায়? কে পানের পিক ফেলল তা দেখার সুযোগ নেই।’ রক্ষণাবেক্ষণ ম্যানেজারদের দাবি, বছরে বড়জোর একবার বা দুবার তারা সিট কাভার পরিবর্তন করেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম পরিবহনের মালিকদের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, তারা বারবার নির্দেশ দিলেও মালিকরা পরিচ্ছন্নতা মানছেন না। অন্যদিকে, বিআরটিএ-র পক্ষ থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে সড়কে ফিটনেসবিহীন ও নোংরা গাড়ির সংখ্যা কমছে না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, এই খামখেয়ালিপনার মূল কারণ তদারকির অভাব। তিনি প্রতিটি বাস স্ট্যান্ডে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ‘ওয়াশিং জোন’ চালুর দাবি জানান।
বিশেষজ্ঞরা যাতায়াত ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে নিচের সুপারিশগুলো প্রদান করেছেন: বাধ্যতামূলক জীবাণুমুক্তকরণ: প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার প্রতিটি বাস জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা। পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ: প্রতিটি রুটে স্বতন্ত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী রাখা যারা ট্রিপ শেষে বাসটি দ্রুত ঝাড়পোছ করবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং: বাসের পরিচ্ছন্নতার মান অনুযায়ী রেটিং ব্যবস্থা চালু করা এবং ফিটনেস নবায়নের সময় পরিচ্ছন্নতাকে প্রধান শর্ত করা। আচরণগত পরিবর্তন: চালক ও হেল্পারদের যাত্রীসেবা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া।
সর্বোপরি, ঢাকার গণপরিবহন আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সুস্থ মানুষ বাসে উঠে অসুস্থ হয়ে ফিরছেন। পরিবহন খাত থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আয় হলেও সাধারণ যাত্রীদের নুন্যতম স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি রয়ে গেছে অন্ধকারে। যদি এখনই বিআরটিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং মালিক সমিতি সম্মিলিতভাবে বাসের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে কঠোর না হয়, তবে এই মহানগরী এক বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়বে। রিঙ্কু দাসের মতো লাখো যাত্রীর কাছে গণপরিবহন যেন আর ‘রোগের বাহক’ না হয়, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন