একসময় যে চত্বরটি মুখরিত থাকত হাজারো চলচ্চিত্রপ্রেমীর উল্লাস, হাততালি আর শিসের শব্দে; আজ সেখানে ভর করেছে এক শ্মশানের নীরবতা। সময়ের বিবর্তনে, মাল্টিপ্লেক্সের চাকচিক্য আর হাতের মুঠোয় থাকা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দাপটে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একক পর্দার (সিঙ্গেল স্ক্রিন) সিনেমা হলগুলো এখন রূপ নিয়েছে এক একটি স্মৃতির কঙ্কালে। ‘জরাজীর্ণ প্রেক্ষাগৃহের ধূসর বর্তমান’ যেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের এক সোনালী অধ্যায়ের করুণ জীবনাবসানকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাজধানীর ‘আজাদ’ কিংবা ‘মধুমিতা’র মতো ঐতিহ্যবাহী হলগুলোর প্রবেশদ্বারে গেলেই চোখে পড়ে এক বুকভাঙা বিষণ্নতার চিত্র। খসে পড়া দেয়ালের প্লাস্টার, ছাদ চুইয়ে পড়া পানির দাগ, ভাঙা প্রজেক্টর রুম আর ধুলোমাখা জরাজীর্ণ আসনের সারি জানান দেয়- এখানে থমকে গেছে রূপালী পর্দার স্বপ্নিল আলো।
পাকিস্তান আমল থেকে কাজ করা প্রবীণ কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস আর শূন্য টিকিট কাউন্টার আজ এই শিল্পের নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী। বছরজুড়ে চরম ব্যবসায়িক মন্দা আর দর্শকখরায় ভুগতে থাকা এই হলগুলো এখন কেবল ঈদ বা বড় কোনো তারকার সিনেমা মুক্তিকে ঘিরে সাময়িক প্রাণ ফিরে পায়।
কিন্তু উৎসবের সেই কৃত্রিম হাওয়া কি পারবে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে থাকা এই লোকসানি ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে? নাকি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিকায়নের অভাবের চড়া মূল্য চুকিয়ে অচিরেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে সিঙ্গেল স্ক্রিনের শেষ পর্দাটি- সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর কয়েকটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ঘুরে দেখা যায় এক বুকভাঙ্গা বিষণ্নতার চিত্র। অনেক হলের প্রধান ফটকে ঝুলছে মরচে ধরা তালা, যা যেন এক নিভে যাওয়া স্বপ্নের নির্বাক প্রতীক। হলের ভেতরের থমথমে নীরবতা, ধুলোমাখা জরাজীর্ণ আসন, ভাঙা প্রজেক্টর রুম আর নিস্তব্ধ টিকিট কাউন্টারে ফুটে উঠেছে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকা এক শিল্পের অন্তিম আর্তনাদ।
পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ ‘আজাদ সিনেমা হল’। প্রায় ছয় দশকের পুরোনো এই হলটি এখন সময়ের ভারে ক্লান্ত এক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
ভেতরের জীর্ণ দশা: হলের ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে ভাঙা সিটের সারি, পুরোনো দেয়ালের খসে পড়া প্লাস্টার আর ছাদ চুইয়ে পড়া পানির দাগ। ফাঁকা হলরুমজুড়ে জমে থাকা ধূলিকণা আর নীরবতা জানান দেয় এর করুণবাস্তবতার কথা। কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস: এই হলের এক প্রবীণ কর্মচারী, যিনি পাকিস্তান আমল থেকে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে এখানে কর্মরত, তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে এই হলে কাজ করছি। একসময় এখানে টিকিট পাওয়ার জন্য মানুষের হুড়োহুড়ি লেগে যেত, ব্ল্যাকেও টিকিট পাওয়া যেত না।
আর এখন? শাকিব খানের কোনো বড় সিনেমা ছাড়া এই হলে মানুষ আসেই না। সারা বছর দুই-চারজন দর্শক নিয়ে শো চালাতে হয়। লোকই যদি না আসে, তবে মালিক হল চালাবে কীভাবে আর আমাদের বেতনই বা কোত্থেকে হবে?’
একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও জমজমাট ‘অভিসার সিনেমা হল’-এর কার্যক্রম এখন পুরোপুরি বন্ধ। হলের বাইরের দেয়ালে এখন আর চোখে পড়ে না নতুন কোনো সিনেমার রঙিন বা জমকালো পোস্টার। নেই দর্শকদের সেই চেনা কোলাহল বা বাদাম বিক্রেতাদের হাঁকডাক। বাইরে থেকে এখন এটি দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় এই চত্বরটি প্রতিদিন হাজারো চলচ্চিত্রপ্রেমীর পদচারণায় মুখর থাকত। ব্যবসায়িক লোকসান সইতে না পেরে এই হলের রূপান্তর ঘটেছে বাণিজ্যিক ভবনে।
রাজধানীর মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী ‘মধুমিতা সিনেমা হল’ ছিল আধুনিক ও মানসম্মত সিনেমা প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিশেষ করে ঈদের ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলোর মূল আকর্ষণই থাকত মধুমিতাকে ঘিরে। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দর্শক সংকট এবং ক্রমাগত ব্যবসায়িক মন্দার কারণে বর্তমানে এই হলের নিয়মিত প্রদর্শনী প্রায় বন্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছে। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম আর বিশাল পর্দা থাকা সত্ত্বেও দর্শক খরা এই হলটিকে এক গভীর নীরবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যোগাযোগ ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গেল স্ক্রিন বা একক পর্দার হলগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে- রিবেশ ও আধুনিকতার অভাব: পুরোনো হলগুলোর নোংরা পরিবেশ, ভাঙা সিট, নিম্নমানের সাউন্ড সিস্টেম এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) অকেজো থাকা।
বিকল্প বিনোদন: স্মার্টফোন এবং সস্তা ইন্টারনেটের যুগে মানুষ এখন ড্রয়িংরুমে বসেই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখার সুযোগ পাচ্ছে। মাল্টিপ্লেক্সের উত্থান: উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির দর্শকরা এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ফুডকোর্টের সুবিধার কারণে স্টার সিনেপ্লেক্স বা লায়ন সিনেমাসের মতো মাল্টিপ্লেক্সমুখী হচ্ছেন।
সারা বছর চরম খরা আর দর্শকশূন্যতায় ভুগলেও, ঈদ বা বিশেষ কোনো উৎসব এলে ঢাকার এই পুরোনো জরাজীর্ণ হলগুলোর চিত্র কিছুটা হলেও বদলে যায়। শাকিব খানের মতো বড় তারকাদের বহুল আলোচিত কোনো সিনেমা মুক্তি পেলে ঢল নামে সাধারণ দর্শকদের।
ঈদের দিনগুলোতে দুই-একটি আলোচিত সিনেমাকে ঘিরে টিকিট কাউন্টারে আবার ভিড় জমে, বাড়ে কোলাহল। সাময়িক এই প্রাণচাঞ্চল্যে জরাজীর্ণ হলগুলো যেন কিছুদিনের জন্য আবার নতুন জীবন ফিরে পায়। এই উৎসবের দিনগুলোই প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো বড় পর্দায় সিনেমা দেখার পুরোনো আবেগ পুরোপুরি মুছে যায়নি।
চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি একটি দেশের সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঢাকার এই পুরোনো সিনেমা হলগুলো শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এগুলো বহন করছে একেকটি প্রজন্মের স্মৃতি ও আবেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ ছাড়া সারা বছর সিনেমা প্রদর্শনীর এই পুরোনো সংস্কৃতিতে যদি এভাবে ধস নামতে থাকে, তবে অচিরেই ঢাকার বুক থেকে একক পর্দার হলের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল লোকসানের দোহাই দিলে চলবে না। সরকারি অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে হলগুলোর আধুনিকায়ন (এসি ও উন্নত আসন ব্যবস্থা) করা জরুরি।
একই সাথে সারা বছর মানসম্পন্ন ও দর্শকপ্রিয় দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ বাড়াতে হবে। তবেই ওটিটি আর মাল্টিপ্লেক্সের এই যুগেও ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে থাকা ঐতিহ্যবাহী হলগুলো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে এবং রূপালি পর্দার পুরোনো আবেগ বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন