তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেট কেবল একটি বিলাসিতা নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রই এখন ডিজিটাল সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশজুড়ে বিনামূল্যে ইন্টারনেট বা ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ সেবা চালুর কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। সমপ্রতি দেশের আটটি বিমানবন্দর ও ছয়টি রেল স্টেশনে এই সেবার উদ্বোধন করা হয়েছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
গত ১৭ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবার সূচনা করেন। সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো- বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনের মতো ব্যস্ততম স্থানগুলোতে যাত্রীসেবা উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষকে বৈশ্বিক মানের ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এটিকে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সরকারের লক্ষ্য হলো- সিঙ্গাপুর, দুবাই বা লন্ডনের মতো উন্নত বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীরা যে ধরনের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা পান, বাংলাদেশের প্রবেশদ্বারগুলোতেও একই নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন ডাটা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে। তবে এই অসীম সম্ভাবনার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক বা ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা চুরির ঝুঁকি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওটিপি বা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে চললে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।’ এছাড়া ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ইন্টারনেটের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারের ট্যাক্স ও ভ্যাট কাঠামোতে ইতিবাচক সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে করের হার ৫১-৫৬ শতাংশের মতো, যা আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, দেশের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা কতটুকু? বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) আশ্বস্ত করেছে যে, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বর্তমানে দুটি ক্যাবল সিস্টেমের মাধ্যমে দেশে প্রায় ৭,২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
অধিকন্তু, ২০২৭ সালের শুরুতে তৃতীয় একটি সাবমেরিন ক্যাবল চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি যুক্ত হলে দেশের সক্ষমতা প্রায় ৩৮ হাজার জিবিপিএসে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে ব্যান্ডউইথের কোনো ঘাটতি থাকবে না, যা ডিজিটাল অর্থনীতির গতিকে আরও বেগবান করবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, সূত্র ও তথ্যানুযায়ী, ডিএসসিসি এলাকার অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য শুরুতে মোট ১১টি স্থানের নাম উল্লেখ করে পেপারে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে, এর মধ্যে ৯টি পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি থাকা ২টি পশুর হাটও দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। পশুর হাট সংলগ্ন নির্ধারিত এলাকার চূড়ান্ত হওয়া হাটগুলোয় যাতে কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ না হয় এবং মূল সড়কগুলোয় যেন যানজটের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে ইজারাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি): অন্য দিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট ছাড়াও বেশ কিছু অস্থায়ী হাট বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ প্রথমে মোট ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য পেপারে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, বিজ্ঞাপিত ১৬টি হাটের মধ্যে ১০টি পশুর হাট ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আরও ১টি হাট চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উত্তর সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে। চূড়ান্ত হওয়া খালি জায়গাগুলোয় এসব অস্থায়ী হাট বসবে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাটগুলোয় ডিজিটাল পেমেন্ট বুথ, ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত আলো ও পানির ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।
দেশের পশুর পর্যাপ্ত জোগান— আমদানিমুক্ত দেশীয় বাজার: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেয়া সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত গবাদিপশু দেশে প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদা ও জোগানের পরিসংখ্যান, ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর সারা দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ।
এর বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরে খামারি ও সাধারণ কৃষকদের গোয়ালে প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখেরও বেশি গবাদিপশু। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখেরও বেশি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। দেশীয় পশুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সম্পূর্ণ দেশীয় ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গবাদিপশু দিয়ে এবার দেশের শতভাগ কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাইরে থেকে কোনো পশু আমদানির প্রয়োজন নেই বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এতে দেশীয় খামারিরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
অনলাইন পশুর হাটের জনপ্রিয়তা, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ডিজিটাল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শতভাগ দেশীয় ও অর্গানিক উপায়ে মোটাতাজা করা গরুর ছবি ও ভিডিও দেখে ঘরে বসেই অনেকে অর্ডার নিশ্চিত করছেন। এটি হাটের ভিড় কমানোর পাশাপাশি একটি আধুনিক ও ঝামেলামুক্ত বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
খামারিদের স্বপ্ন ও মূল দুশ্চিন্তা— মহাসড়ক ও হাটের চাঁদাবাজি: সারা দেশের লাখ লাখ খামারি ও সাধারণ চাষিদের জন্য কোরবানি ঈদ হলো বছরের প্রধান আয়ের উৎস। একটি গরুকে সুস্থ ও মোটাতাজা করতে তাদের সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম, রাত জাগা যত্ন এবং উচ্চ মূল্যের দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হয়। এই পশুর বিক্রিলব্ধ অর্থ দিয়েই তাদের সারা বছরের সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরবর্তী বছরের খামারের পুঁজি সংস্থান হয়।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিবছরই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর থেকেই খামারিদের নানা ধরণের ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। তাদের মূল দুশ্চিন্তার বড় কারণগুলো হলো— পরিবহন পথে চাঁদাবাজি, দেশের দূরদূরান্ত (যেমন: কুষ্টিয়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর) থেকে ট্রাকে করে পশু নিয়ে আসার সময় বিভিন্ন মহাসড়কে, ফেরিঘাটে কিংবা সেতুর টোল প্লাজার আশপাশে এক শ্রেণির অসাধু চক্র ও নামধারী বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অবৈধ চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে রাখা বা চালকদের মারধরের ঘটনাও ঘটে।
হাটের ভেতরে হয়রানি ও হাসিল জালিয়াতি অনেক সময় হাটে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালাল চক্রের খপ্পরে পড়তে হয় বিক্রেতাদের। নির্ধারিত হাসিলের চেয়ে বেশি টাকা আদায় করার চেষ্টা এবং কৃত্রিমভাবে ভালো স্থানগুলো দখল করে রাখার কারণে প্রান্তিক খামারিরা চরম বিপাকে পড়েন। জাল টাকার দৌরাত্ম্য, কোরবানির হাটে কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়। এই সুযোগে জাল টাকা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরল-সোজা খামারিদের ধোঁকা দিয়ে জাল নোট ধরিয়ে দেয়ার ভয় খামারিদের সবচেয়ে বেশি তাড়া করে।
সংকট উত্তরণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা: খামারিদের এই গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এবার বিশেষ ও কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মহাসড়ক, নৌপথ এবং পশুর হাটগুলোয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার জন্য পুলিশ, র?্যাব, হাইওয়ে পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর মনিটরিং: সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, পশুবাহী ট্রাকে বা রাস্তায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না। মহাসড়কে কোনো পশুবাহী গাড়ি নির্দিষ্ট কোনো হাটে যাওয়ার জন্য কেউ জোরপূর্বক থামাতে পারবে না। ব্যবসায়ী বা খামারিরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো হাটে পশু নিয়ে যেতে পারবেন। যদি কোনো স্পটে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
হাটে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ: ঢাকার প্রতিটি হাটে পর্যাপ্ত পুলিশ ক্যাম্প এবং ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি অনুমোদিত পশুর হাটে বিনামূল্যে ‘জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ’ স্থাপন করা হবে। খামারি বা ক্রেতারা যেকোনো বড় অঙ্কের নোট সন্দেহ হলে এই বুথগুলো থেকে পরীক্ষা করে নিতে পারবেন। একই সাথে হাটের ভেতরে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি বা ইজারাদারদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত হাসিল আদায় বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ভেটেরিনারি টিম: কোরবানির পশুগুলো যাতে সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকে, সেজন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ঢাকার প্রতিটি হাটে সার্বক্ষণিক মোবাইল ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম বা পশুর ডাক্তার উপস্থিত থাকবেন। কোনো পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পাশাপাশি স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা পশু শনাক্তে এই টিম কাজ করবে।
একটি সফল উৎসবের প্রত্যাশা: ঈদুল আজহার মূল বাণীই হলো ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধি। এই উৎসবের সাথে দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের যে হাটগুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে এবং যেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সেগুলোর হাট ব্যবস্থাপনা যদি সুচারু হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সড়ক ও হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে খামারিরা তাদের পশুর ন্যায্য মূল্য পাবেন।
চাঁদাবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে যেন এ বছরের পশুর হাটগুলো পরিচালিত হতে পারে, সেটাই এখন দেশের সাধারণ ক্রেতা, বিক্রেতা ও খামারিদের একমাত্র বড় প্রত্যাশা। সরকারের নেয়া কঠোর পদক্ষেপগুলোর মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়নই পারে এই উৎসবকে সফল এবং খামারিদের মুখে হাসি ফোটাতে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন