রাজধানীর সব সিগন্যালে বসছে এআই

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম
রাজধানীর সব সিগন্যালে বসছে এআই

রাজধানীর যানজট নিরসন এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করার লক্ষ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা বসানো হয়েছে। গত ৭ মে থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের ফলে রাজধানীর রাজপথে এক দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

গত বুধবার রাত ৯টার চিত্র। রাজধানীর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার মোড়। এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা বসানোর আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এখন চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। লালবাতি জ্বললেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়িগুলো স্টপ লাইনের ভেতরে থেমে যাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা এখন অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন।

ডিএমপির জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এখন আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের ভিডিও ও ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে জমা হচ্ছে। পরে বিআরটিএর সার্ভারের সাথে তথ্য যাচাই করে গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে মামলার ডিজিটাল নোটিশ।

আইন অমান্যকারীদের ধরতে পুলিশ ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক ‘পিটিজেড’ ক্যামেরা। এই ক্যামেরাগুলো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ভিডিও ধারণ করতে পারে এবং চলন্ত বস্তুকেও অনুসরণ করতে সক্ষম। এর শক্তিশালী অপটিক্যাল জুম অনেক দূর থেকেও গাড়ির নম্বর প্লেট নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। প্রতিটি ক্যামেরার মূল্য ৬০ হাজার টাকার বেশি। প্রাথমিকভাবে ৩০টি মোড়ে এই প্রযুক্তি কার্যকর করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সারা ঢাকায় ৫০০টি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ডিএমপির সার্ভারে প্রায় ১২ হাজার ভিডিও ফুটেজ জমা পড়েছে, যা থেকে আইন ভঙ্গের মাত্রা অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৫৪৮টি ডিজিটাল মামলা দায়ের করা হয়েছে। মূলত উল্টো পথে গাড়ি চালানো, জেব্রাক্রসিংয়ে গাড়ি থামানো, সিগন্যাল অমান্য করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধগুলোকে এখন গুরুতর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে এই এআই প্রযুক্তিতে আরও নতুন ফিচার যুক্ত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, প্রাইভেটকারে সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট না পরা।

এছাড়া, লাইসেন্সে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে মোট ১২টি পয়েন্ট থাকে, যা বারবার আইন ভঙ্গের মাধ্যমে শেষ হলে লাইসেন্স বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। এই মহৎ উদ্যোগের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। যেহেতু এগুলোর কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই, তাই ক্যামেরা নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে পারছে না।

এছাড়া কিছু গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট বা নিয়মবহির্ভূত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার পর এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান এই উদ্যোগকে ‘ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার শেষ ওষুধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগ সফল করতে হলে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে অনুমোদনহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এআই প্রযুক্তি পূর্ণ সুফল দেবে না।’

ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই-এর ব্যবহার কেবল একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ আজ এক ধাপ এগিয়েছে। যদিও চ্যালেঞ্জ এখনও অনেক, তবে যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে ঢাকার রাস্তায় শৃঙ্খলা ও গতিময়তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এই অগ্রযাত্রা ট্রাফিক পুলিশের কর্মদক্ষতাকে যেমন বাড়াবে, তেমনি নগরবাসীর যাতায়াতেও আনবে স্বস্তি।