পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার প্রবেশদ্বার ও অন্যতম শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়া এলাকায় ঘরমুখো মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে। সাভারের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্পকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে ছুটি ঘোষণা করায় গতকাল সোমবার সকাল থেকেই মহাসড়কগুলোয় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-আরিচা ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। মুষলধারে বৃষ্টিতে চরম ভোগান্তিতে লাখো মানুষ; বিপাকে পশুর হাট: সকাল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ঘরমুখো মানুষের সেই আনন্দযাত্রাকে এক নিমিষেই রূপ দিয়েছে চরম দুর্ভোগে। সকালটা হালকা মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যায় এবং শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি।
একদিকে সড়ক ও টার্মিনালগুলোয় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, অন্যদিকে আকাশভাঙা বৃষ্টি এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনালসহ সদরঘাট ও রেলওয়ে স্টেশনে আসা যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কিংবা স্টেশনে আটকে থেকে চরম ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন নারী, শিশু এবং বয়স্ক যাত্রীরা। বিশেষ করে সময়মতো গণপরিবহন না পাওয়া এবং বৃষ্টির কারণে রিকশা বা সিএনজির তীব্র সংকটে অনেক পরিবারের যাত্রাই পড়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়।
বৃষ্টির এই নিষ্ঠুর প্রভাব কেবল টার্মিনালগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি আঘাত লেগেছে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের পশুর হাটগুলোয়। গাবতলী, আফতাবনগর, বসিলাসহ বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে কাদা আর পানির একাকার চিত্র। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ধারদেনা করে ও রক্তপানি করা পরিশ্রমে লালন-পালন করা কোরবানির পশু নিয়ে আসা শত শত ব্যাপারি ও খামারিরা পড়েছেন তীব্র সংকটে। বৃষ্টির পানিতে পশুর খাদ্য বা খড় ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অনেক স্থানে ত্রিপল খাটানোর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় খোলা আকাশের নিচে ভিজছে গরু ও ছাগল।
অন্যদিকে, হাটে হাঁটু সমান কাদা ও পানি জমে যাওয়ায় ক্রেতাদের আনাগোনাও হঠাৎ থমকে গেছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, আবহাওয়া এমন থাকলে তারা পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। গতকাল সকাল থেকেই ঢাকার গাবতলী ও আমিনবাজার হয়ে আসা দূরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো সাভারের নবীনগর ও বাইপাইল এলাকা দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সার্ভিস লেনে পরিবহনের চাপ: ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর এলাকায়সার্ভিস লেনে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শত শত দূরপাল্লার বাস প্রায় এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। যাত্রীদের অপেক্ষা: বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাস স্টপেজে হাজার হাজার যাত্রীকে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভিড় আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
কালোবাজারির অভিযোগ: বাড়িফেরা অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, সড়কে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও পুলিশি তৎপরতা থাকলেও টিকিট কাউন্টারগুলোয় কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য থামেনি। অনেকেই নির্ধারিত মূল্যে টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে অথবা টিকিট ছাড়াই বিকল্প উপায়ে যাত্রা শুরু করেন। মহাসড়কে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন।
গত রোববার থেকেই সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে গ্রামে ফিরছেন। মুক্তা হোসেন, অধিনায়ক, বিজিবি টহল টিম (নবীনগর-চন্দ্রা ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক) বলেন, ‘আমরা সর্বদা মাঠে প্রস্তুত রয়েছি, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সড়কে যানজটের সৃষ্টি না হয় এবং ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির সদস্যরা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে হেনস্তা বা প্রতারিত করতে না পারে।’
সাভার হাইওয়ে থানা-পুলিশের অফিসার ইনচার্জ শেখ শাজাহান জানান, সাভার-আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে ঢাকা জেলা উত্তর ট্রাফিক পুলিশ, ডিবি পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবক (ভলান্টিয়ার) কর্মীরা যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিন ধরে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার পোশাক কারখানাগুলো ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে ছুটি দেয়া হচ্ছে। ফলে লাখ লাখ শ্রমিক একসঙ্গে রাস্তায় না নেমে খণ্ড খণ্ডভাবে নামছেন। এই পর্যায়ক্রমিক ছুটির কৌশলের কারণে মহাসড়কে চাপ বাড়লেও বড় ধরনের স্থবিরতা বা দীর্ঘস্থায়ী যানজটের কোনো আশঙ্কা নেই।
ঢাকা জেলা উত্তর ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে সাভার অঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাইপাইল থেকে শ্রীপুর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ককে। এই অংশে বর্তমানে দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
নির্মাণকাজের জন্য সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্মাণসামগ্রী ও ভারী মালামাল স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ফলে এই অংশটি দিয়ে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের যাতায়াত নিয়ে এক ধরনের সংশয় ও ধীরগতির আশঙ্কা ছিল। তবে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ টিম ও হাইওয়ে পুলিশের সার্বক্ষণিক তৎপরতায় এখন পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখা সম্ভব হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাভারের চারটি প্রধান পয়েন্ট- আমিনবাজার, সাভার বাসস্ট্যান্ড, নবীনগর বাসস্ট্যান্ড এবং বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৯০০ দূরপাল্লার বাস দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে- দূরপাল্লার নিয়মিত বাস ৬০০-৯০০টি যাচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে। বিশেষ ও বিকল্প যান (মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, ট্রাক) প্রায় ৬০০টি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। লোকাল জীর্ণ/লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও মিনিবাস প্রায় ২০০টি ঢাকার আশপাশের জেলায় যাতায়াত করছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় ও শিল্পাঞ্চলে চলাচলকারী প্রায় দুই শতাধিক জীর্ণ এবং লক্কড়-ঝক্কড় বাস-মিনিবাস এই সুযোগে ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলোয় দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করছে।
সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, মহাসড়কের ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করে রোড পারমিট এবং ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহন বুক ফুলিয়ে চলাচল করছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সর্বোপরি, প্রতি বছর ঈদের সময় সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের মহাসড়কগুলো স্থবির হয়ে পড়ার নজির থাকলেও, এবার প্রশাসনের আগাম পরিকল্পনা এবং বিজিবি-পুলিশের যৌথ তৎপরতায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাসের মহাসড়কে নেমে পড়া এবং টিকিট কালোবাজারির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রার আনন্দকে কিছুটা ম্লান করছে। ঘরমুখো লাখো মানুষের এই নিরাপদ যাত্রা যেন শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে, সেজন্য হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের কঠোর নজরদারি শেষ দিন পর্যন্ত বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন