প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানি হওয়া পশুর প্রতিটি অংশই অত্যন্ত মূল্যবান এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। যেমন পশুর হাড় ও দাঁত : গবাদিপশুর হাড় পুড়িয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ‘বোন চার’ ও জেলাটিন তৈরি করা হয়। এই জেলাটিন ক্যাপসুলের কভার (আবরণ), ওষুধ শিল্প, সিরামিক পণ্য (হাড়ের তৈরি চিনা মাটির বাসনকোসন), এবং উচ্চমানের খেলনা ও শোপিস তৈরিতে ব্যবহূত হয়।
শিং ও খুর : এগুলো দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত বোতাম, নানা পদের অলংকার, চিরুনি এবং চমৎকার হস্তশিল্প তৈরি করা হয়।
চর্বি ও ফ্লেশিং বর্জ্য : পশুর চর্বি থেকে সাবান, উচ্চমানের প্রসাধনী, গ্লিসারিন ও বিভিন্ন লুব্রিকেন্ট বা শিল্পপণ্য তৈরি হয়। মাথার চামড়া ও লেজ : গরুর মাথার চামড়া অত্যন্ত শক্ত ও টেকসই হওয়ায় তা দিয়ে সেনাবাহিনী বা পুলিশের বিশেষ বুটজুতা তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া লেজের চুল বা পশম দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পেইন্টিং ব্রাশ এবং শিল্প সামগ্রী তৈরি করা যায়। রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি : এগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে অত্যন্ত পুষ্টিকর পশুখাদ্য, মাছের খাবার (ফিশ মিল) এবং শতভাগ পরিবেশবান্ধব উন্নতমানের জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব।
একসময় বাংলাদেশে চামড়ার পাশাপাশি পশুর হাড়, শিং ও লেজের চুল সংগ্রহের একটি চমৎকার অপ্রচলিত রপ্তানি বাজার সচল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সঠিক তদারকি ও নীতিগত সহায়তার অভাবে এই খাতটি প্রায় ধ্বংসের মুখে। কালাম ব্রাদার্স ট্যানারির মালিক হাজী মো. কামাল তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘একসময় আমাদের দেশেই গরুর মাথার চামড়া দিয়ে ভালোমানের বুটজুতা তৈরির কারখানা ছিল, যা সেনাবাহিনী ও পুলিশ ব্যবহার করত। তখন একটা মাথার চামড়াই ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন বাজারে সেগুলোর চাহিদা না থাকায় আমরা তা রাস্তায় ফেলে দিচ্ছি। আগে যখন ওয়েট ব্লু (আংশিক প্রক্রিয়াজাত) চামড়া রপ্তানির অবাধ অনুমতি ছিল, তখন বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এসে এসব উপজাতও কিনে নিয়ে যেতেন। এখন সেই সুযোগ নেই। লাভ না থাকলে মানুষ কেন কষ্ট করে এসব সংগ্রহ করবে।’
পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকার প্রবীণ চামড়া ব্যবসায়ী হাজী মো. শামসুল হক জানান, পশুর বর্জ্য সংরক্ষণে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট দূরদর্শী পরিকল্পনা নেই। চামড়া নিয়ে হিমশিম খেতেই সরকারের সব শক্তি শেষ হয়ে যায়। অথচ এই বর্জ্য রপ্তানি করে একসময় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসত। এখনো সামান্য যা হচ্ছে, তা খুবই সীমিত আকারে ব্যক্তিউদ্যোগে। পোস্তায় রাস্তার পাশে বসে ফেলে দেয়া গরুর লেজের পশম বাছাই করার সময় মো. শামছু মিয়া নামের এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ তার দীর্ঘ ৪০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আগে একটা গরুর মাথার চামড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং শিং প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করেছি। আর লেজের চুল বিক্রি করেছি ৩০০ টাকা কেজি। এখন বয়স হয়েছে, তাই রাস্তায় ফেলে রাখা লেজ থেকে চুল সংগ্রহ করছি, যা বড়জোর ৭০-৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে পারে। চাহিদা না থাকায় মানুষ এসব রাস্তায় ফেলে রাখে, পরে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে ময়লা হিসেবে নিয়ে যায়।’
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোরবানির ঈদে শুধু ঢাকা মহানগরেই প্রায় ৩৫ হাজার টন গবাদিপশুর বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে বড় অংশই হচ্ছে হাড়, শিং, নাড়িভুঁড়ি, রক্ত ও চর্বি। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি একটি সুনির্দিষ্ট চেইনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যেত, তবে দেশের চামড়া শিল্পনগরী ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ সস্তা কাঁচামাল পেত।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান বলেন, আধুনিক স্টোরেজ সুবিধা এবং সঠিক নীতিগত সহযোগিতা পেলে এই অপ্রচলিত খাত থেকেই বাংলাদেশ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অর্থনীতিতে বড় জোগান দিতে পারত। বর্তমানে বাংলাদেশের ডেইরি ও মৎস্য খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো পশুখাদ্যের চড়া মূল্য। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে পশু ও মাছের খাদ্যে ব্যবহূত প্রোটিনের একটি বড় অংশ চড়া মূল্যে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার কারণে প্রতি কেজি প্রোটিন আমদানিতে সরকারের ৭০ থেকে ৮০ টাকা ব্যয় হয়।
অথবা, দেশেই যদি কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট, রক্ত ও নাড়িভুঁড়িকে প্রক্রিয়াজাত করে প্রোটিন বা ফিড তৈরি করা যায়, তবে প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ পড়বে মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা। এটি দেশের পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য শিল্পে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে পারে এবং পশুখাদ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে। ঢাকার সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে দীর্ঘদিন ধরে কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট) এক বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল। তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু নতুন ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।
তিনি জানান, ট্যানারির কঠিন বর্জ্য মূলত তিন প্রকার-র’ট্রিমিংস, ক্রোম শেভিং ডাস্ট এবং ফ্লেশিং। এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। র-ট্রিমিংস (মাথা, শিং ইত্যাদি) : কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যারা এগুলো দিয়ে চাবির রিং, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন সৌখিন চামড়াজাত পণ্য তৈরি করছে। ক্রোম শেভিং ডাস্ট : এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য। একটি চীনা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত এই বর্জ্য সংগ্রহ করে বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করছে এবং তা যাতে কোনোভাবেই খাদ্যশৃঙ্খলে (যেমন মুরগি বা মাছের খাদ্যে) প্রবেশ না করে তা নিশ্চিত করে বিদেশে রপ্তানি করছে।
ফ্লেশিং বা চর্বিযুক্ত বর্জ্য : এই চর্বি থেকে ক্যাপসুলের আবরণ তৈরির উপাদান ‘জেলাটিন’ উৎপাদনের জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি স্থানীয় ট্যানারি মালিকরাও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দেড় বছরের মধ্যে সাভারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি শতভাগ পরিবেশবান্ধব বড় পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন পণ্যের অন্তর্ভুক্তি খুব জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চামড়ার মতো পশুর হাড় ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট সংগ্রহেও জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক গাইডলাইন বা রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন এবং ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে কোরবানিদাতাদের সচেতন করতে কোরবানির আগে মসজিদভিত্তিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে, যাতে পশুর রক্ত বা হাড় যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা হয়।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন