রাজধানীকে সবুজায়ন ও বায়ুদূষণ মুক্ত করার স্লোগান দিয়ে শুরু হয়েছিল ‘গ্রিন ঢাকা’ প্রকল্প। কাগজের কলমে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) এই উদ্যোগ ছিল পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে চরম অনিয়ম আর অর্থ আত্মসাতের এক নিকৃষ্ট উদাহরণের।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ঢাকা ‘গ্রিন’ করার নামে বরাদ্দকৃত অর্ধকোটি টাকারও বেশি লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন ডিএনসিসির দুই অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের টাকা বৃক্ষরোপণে ব্যবহার না হয়ে সরাসরি চলে গেছে ওই কর্মকর্তাদের পকেটে। রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে শূন্য, জরাজীর্ণ ড্রাম; কিন্তু সেখানে কোনো গাছ নেই।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় গাছ লাগানো এবং মাটির ব্যবস্থাপনার জন্য মোট ৫৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কেবল মিরপুর-১ থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত প্রধান সড়কের পাশে ৭০০টি টবে গাছ লাগানোর নামে ব্যয় দেখানো হয় ২২ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের এক বছর পর এসে মিরপুর এলাকার ওই ৭০০টি টবের একটিতেও কোনো গাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারী পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সড়কগুলোয় কখনোই কোনো সতেজ বা পরিকল্পিত গাছ তারা দেখেননি। টব হিসেবে ব্যবহূত ড্রামগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা অবস্থায় পড়ে থেকে ধুলাবালির স্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এখানে দোকান খুলি। কিছু ড্রাম এনে রাস্তার আইল্যান্ডে রাখা হয়েছিল সত্য, কিন্তু সেগুলোয় ভালো কোনো গাছ কখনোই লাগানো হয়নি। দু-একটা লোকদেখানো চারা দেয়া হলেও পরিচর্যার অভাবে সেগুলো দুদিনেই মরে যায়। এখন শুধু ভাঙা ড্রামগুলো পড়ে আছে, যা উল্টো রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট করছে।’ অর্থ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায় পুনর্ব্যবহারের কেনা নিয়েও ঘটেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। বিষয়টি নিয়ে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের কোনো কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে ডিএনসিসির তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেমের বক্তব্য থেকে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তিনি জানান, এই প্রকল্পের জন্য আলাদা করে কোনো টব বা ড্রাম কেনাই হয়নি। সিটি কর্পোরেশনের মশার ওষুধ ছিটানোর পর যে খালি ড্রামগুলো জমা হয়, সেগুলো কেটেই টব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৌশলী আবুল কাশেমের বলেন, ‘আমরা যে ড্রামগুলো ব্যবহার করছি সেগুলো কেনা ড্রাম না। এগুলো মশার ওষুধের ড্রাম, রিইউজ করা হয়েছে।’
প্রশ্ন উঠেছে, যদি টব কেনাই না হয়ে থাকে এবং মশার ওষুধের ব্যবহূত সরকারি ড্রামই কেটে বসানো হয়, তবে গাছ ও মাটির নামে বরাদ্দকৃত প্রায় ৫৯ লাখ টাকা কোথায় গেল। ২২ লাখ টাকার চারাগাছ ও মাটির হিসাবই বা কোথায়। প্রকল্পের ব্যর্থতা এবং গাছ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আর্বোরিকালচার কর্মকর্তা মো. সাঈদী করিমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গণমাধ্যমের কাছে আংশিক দায় স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ‘এটাতে একটু সমস্যা আছে। সব জায়গায় যে নাই, তা না। কিছু জায়গায় গাছ নষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি দাবি করেছিলেন যে, রাজধানীর কোন কোন এলাকায় গাছ লাগানো হয়েছে তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তাদের কাছে আছে এবং তারা তা সরবরাহ করতে পারবেন। কিন্তু সেই তালিকা ধরে যখন বর্ধিত পল্লবী আবাসিক এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়, তখন জালিয়াতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পল্লবী আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও সারিবদ্ধ ড্রাম পড়ে আছে কিন্তু কোনো গাছ নেই। সেখানে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানান, ড্রামগুলো যখন আনা হয়েছিল, সেগুলো ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ, বাঁকা এবং রঙহীন। পরে সেগুলোকে রঙ করে প্রস্তুত করার কথা বলা হলেও কাজ আর এগোয়নি। ফলে গাছ লাগানোর প্রক্রিয়াটি কেবল ড্রাম বসানোর কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের চূড়ান্ত সত্য জানতে এবং বরাদ্দের টাকা ব্যয়ের রশিদ দেখতে যখন সংবাদকর্মীরা পুনরায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে যান, তখন অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। উল্টো তারা সাংবাদিকদের এড়াতে নিজেদের দপ্তরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন এবং কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
গাছ লাগানোর নামে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতকে জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় এবং সরাসরি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন দেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশকর্মীরা। নেতিবাচক এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে নগরবিদ ও পরিবেশকর্মী ইকবাল হাবিব বলেন, ‘টবের গাছ লাগিয়ে তা পরিচর্যা না করার মাধ্যমে কার্যত জীবন্ত গাছগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। এটি কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, এটি একটি পরিবেশগত অপরাধ। প্লাস্টিকের বা টিনের ড্রাম কেটে রাস্তায় ফেলে রাখা নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর বদলে তা আরও বিঘ্নিত করছে। এই ধরণের জঘন্য প্রতারণার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ পরিবেশের নামে এমন লুটপাট করার সাহস না পায়।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এমনিতেই তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। একেক এলাকায় তাপমাত্রার পার্থক্য এখন ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা জরুরি, সেখানে সরকারি অর্থ লোপাটের এই ঘটনা ঢাকার পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করবে। ডিএনসিসির এই বৃক্ষরোপণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ‘গ্রিন ঢাকা’ প্রকল্পের অধীনে যারা বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন, তারা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করে থাকেন এবং অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সর্বোপরি, একটি মেগাসিটিকে বাসযোগ্য ও সবুজ করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু যখন সেই উদ্যোগটিই কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেট ভরার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা নগরবাসীর জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘গ্রিন ঢাকা’র নামে মশার ওষুধের ড্রাম কেটে রাস্তায় ফেলে রেখে ৫৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা লোপাটের এই ঘটনা আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন