এভিয়েশন খাতের অদৃশ্য নীরবতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ১২:২৯ এএম
এভিয়েশন খাতের অদৃশ্য নীরবতা

বাংলাদেশের আকাশপথের সেবায় এক নীরব বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দেশের বিমান পরিবহন খাতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ১৬টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) কোনো বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কড়া নির্দেশনা ও বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার টিকিট বিক্রি ও কার্গো বুকিং দিচ্ছে। এর ফলে একদিকে সরকার যেমন বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা পড়ছেন ভয়াবহ আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিতে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বেবিচক এক আদেশের মাধ্যমে ১৬টি প্রভাবশালী জিএসএ প্রতিষ্ঠানের সাময়িক অনুমতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। তবে ওই আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, নিয়মিত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এটি কেবল একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা’। শর্তানুসারে, এই মেয়াদের কার্যকারিতা ছিল গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত।

আদেশের শর্তানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা আমলে নেয়নি। ফলে গত এপ্রিল মাস থেকে এসব প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে ‘অবৈধ’ বা ‘অনুমোদনহীন’ অবস্থায় কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করে যাচ্ছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্সহীন জিএসএ-র মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করা কেবল বেআইনিই নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

এর ফলে নিচের ঝুঁকিগুলো প্রকট হয়ে উঠছে— ১. আইনি সুরক্ষাহীনতা : কোনো কারণে ফ্লাইট বাতিল, অর্থ আত্মসাৎ বা কার্গো জটিলতা তৈরি হলে ভুক্তভোগী যাত্রী বা ব্যবসায়ীরা আইনি প্রতিকার পাবেন না। কারণ যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, আইনিভাবে তার কোনো বৈধ সত্তা নেই।

২. অর্থ পাচার ও ডলার সংকট : প্রতিদিন আন্তর্জাতিক টিকিটিংয়ের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয়। লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমে আর্থিক স্বচ্ছতা থাকে না, যা অবৈধ ডলার লেনদেন ও অর্থ পাচারের পথ প্রশস্ত করে।

৩. রাজস্ব ক্ষতি : নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতার বাইরে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান সরকারকে যথাযথ কর ও ভ্যাট প্রদান থেকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

৪. জাতীয় নিরাপত্তা : আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কমপ্লায়েন্স অনুসরণ না করা জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগের কারণ।

বেবিচকের লাইসেন্সিং বিধিমালার ২(খ) ধারা অনুযায়ী, মূল অনুমোদনের সব শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলার কথা। আবার ২(ঘ) ধারা অনুযায়ী, যে কোনো সময় কারণ দর্শানো ছাড়াই মেয়াদ বাতিল করার ক্ষমতা রাখে কর্তৃপক্ষ। তা সত্ত্বেও, মেয়াদ শেষ হওয়ার আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও এসব প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি এবং কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ কার্যক্রম প্রশ্রয় পাচ্ছে।

তবে বেবিচকের সদস্য (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) এয়ার কমোডর মুকিত উল আলম মিয়া জানিয়েছেন, কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তাদের পক্ষ থেকেই নবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং অবৈধভাবে ব্যবসার কোনো সুযোগ রাখা হবে না। সর্বোপরি, আকাশপথের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবাকে জিম্মি করে প্রভাবশালী জিএসএ প্রতিষ্ঠানগুলোর এই একচেটিয়া ও অবৈধ কার্যক্রম কোনোভাবেই কাম্য নয়।

একটি দেশের এভিয়েশন খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অবিলম্বে এই ১৬টি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যাচাই করে লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অথবা আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অন্যথায়, বড় কোনো প্রতারণা বা বিপর্যয় ঘটলে তার দায়ভার কে নেবে সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই।