দেশ আজ এক নীরব অথচ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী মহামারির মুখোমুখি, যা আমাদের সমাজ ও অপরাধ জগতের চেনা সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরে ইয়াবা, ফেনসিডিল বা হেরোইনের মতো প্রথাগত মাদক সমাজকে গ্রাস করলেও সামপ্রতিক সময়ে অপরাধের জগতে যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও ভয়ংকর মাত্রা, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নতুন প্রজন্মের মাদক আতঙ্ক’।
এটি কেবল কোনো সাধারণ মাদকের বিস্তার নয়, বরং উচ্চপ্রযুক্তির ছদ্মবেশে তরুণ প্রজন্মের মগজ ও ভবিষ্যৎ ধুয়ে-মুছে ফেলার এক সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। আইস, এলএসডি, ক্রিস্টাল মেথ, ম্যাজিক মাশরুম, ফেন্টানাইল কিংবা কিটামিনের মতো সিনথেটিক বা কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি এই মাদকগুলো প্রথাগত মাদকের চেয়ে বহুগুণ বেশি মরণঘাতী, ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত দ্রুত আসক্তি তৈরি করতে সক্ষম।
নতুন প্রজন্মের মাদকের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর বিপণন ও সরবরাহ চেইন। টেকনোলজি বা ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মাদক কারবারিরা এখন আর কোনো প্রকাশ্য সীমান্ত বা গলির মোড়ে হাতবদল করছে না। ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপস এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিভৃতেই এই মরণনেশার বাজার সমপ্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিস, কুরিয়ার কিংবা বৈধ ওষুধের চেইনের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে এই বিষ প্রবেশ করছে খোদ রাজধানীর অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাটগুলোতে।
ধনিক শ্রেণির তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এই ব্যয়বহুল মাদকের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। যেহেতু এসব মাদকের অনেকগুলোই গন্ধহীন, বর্ণহীন বা সাধারণ চকোলেট, ব্লুটুথ স্পিকার কিংবা কাগজেরস্ট্যাম্পের আকারে পাওয়া যায়, তাই পরিবারের চোখের আড়ালে থেকে এগুলো সেবন করা এবং ছড়িয়ে দেয়া অনেক সহজ হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত হওয়া ‘মিনি ড্রাগ ল্যাব’ বা কৃত্রিম মাদক তৈরির কারখানা আমাদের এই আশঙ্কার গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর অর্থ হলো, আমরা কেবল আমদানিকৃত মাদকের শিকার নই, বরং দেশের ভেতরেই বিষ তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে। এটি জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অভূতপূর্ব হুমকি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের চিরাচরিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে মাঠে নামলেও সাইবার অপরাধের এই নতুন মোড়ক মোকাবিলা করা সাধারণ নজরদারি বা প্রথাগত সীমান্ত পাহারা দিয়ে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিগত ২০১৮ সালের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ পর্যন্ত ডজনেরও বেশি নতুন প্রজন্মের মাদকের সন্ধান পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায়, এটি কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। এই সর্বনাশা চক্রকে যদি এখনই গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা না যায়, তবে আমরা এমন এক পঙ্গু ও মেধাশূন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে এগিয়ে যাব, যা কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। তাই এই নতুন বিপদের স্বরূপ উন্মোচন করা, এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল লেনদেনের অশুভ ফাঁদ সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাদক কারবারিরা এখন বেছে নিয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির সব নেশাদ্রব্য। এই তালিকায় রয়েছে এমডিএমবি, আইস (মেথামফেটামিন), খাথ, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ, ট্যাপেন্টাডল, ট্রামাডল এবং কিটামিন।
এই মাদকগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এগুলো অত্যন্ত দ্রুত আসক্তি তৈরি করে এবং ব্যবহারকারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। বিশেষ করে ধনিক শ্রেণির তরুণ প্রজন্ম এসব মাদকের প্রধান ভোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রথাগত হাতবদল বা সীমান্তভিত্তিক চোরাচালান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আড়ালে ঢাকা পড়ছে। সূত্র মতে, নতুন প্রজন্মের অন্তত ৯০ শতাংশ মাদক কেনাবেচা ও অর্থ লেনদেন হয় অনলাইনে। মাদক কারবারিরা এখন ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপস এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
উত্তরা এলাকায় সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া একটি ‘মিনি ল্যাব’ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিদেশ থেকে আমদানির পাশাপাশি এখন দেশীয় ল্যাবেও সিনথেটিক মাদক প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। ব্লুটুথ স্পিকার বা সাউন্ড সিস্টেমের ভেতর কিটামিন পাউডার লুকিয়ে বাজারজাত করার মতো কৌশলী কর্মকাণ্ড এটাই প্রমাণ করে যে, মাদক কারবারিরা কতটা সুসংগঠিত।
নতুন মাদকের পাশাপাশি পুরনো মাদকের বিস্তারও কোনো অংশে কমেনি। ইয়াবা, হেরোইন এবং কোকেন জব্দের পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে পরিস্থিতি কতটা আতঙ্কজনক। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে ৪০ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে, যা গত বছরের মাসিক গড় অপেক্ষা অনেক বেশি। হেরোইন ও কোকেনের জব্দ হওয়া পরিমাণও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মাদক যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে সেবনকারীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত মাদক কারবার মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬’ এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত আইনে অনলাইন মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা বা সরবরাহকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। ই-ওয়ালেট- ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদকের অর্থ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিস এবং সাপ্লাই চেইন তদারকিতে আরও শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, উঠতি বয়সি তরুণদের মধ্যে অনলাইন অর্ডার ও ডার্ক ওয়েবের প্রতি আসক্তি কমাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জরুরি।
মাদকের এই নতুন রূপান্তর আমাদের পরিবার ও সমাজের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যেভাবে মাদক তরুণ প্রজন্মের রন্র্লে রন্র্লে প্রবেশ করছে, তা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে একটি মেধাশূন্য ও পঙ্গু প্রজন্ম গড়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়। আইন সংস্কার এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজকে নিয়ে সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। যদিও দেশের প্রতিটা মানুষ তথা প্রতিটা সমস্যা পয়েন্টআউট ও সমাধান সরকারেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মাদকের এই ডিজিটাল জাল ছিন্ন করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন এবং সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়ানো সরকারের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন