ভাগাড় হয়ে উঠছে থানা প্রাঙ্গণ

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ১২:৫২ এএম
ভাগাড় হয়ে উঠছে থানা প্রাঙ্গণ

বিচারপ্রার্থী মানুষের ন্যায়বিচারের বড় অনুষঙ্গ হলো মামলার আলামত। কিন্তু সেই আলামত যখন নিজেই এখন বিচারব্যবস্থার জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। দেশের প্রতিটি থানা ও আদালত প্রাঙ্গণের চিত্র এখন যেন একটি বিশাল ডাম্পিং স্টেশন বা মালামালের ভাগাড়।

সারি সারি রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মরচে পড়া শত শত ট্রাক, বাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল যাতে এখন আর যান্ত্রিক প্রাণ নেই, আছে কেবল দীর্ঘদিনের অবহেলা আর পড়ে থাকার করুণ পরিণতি। শুধু যানবাহন নয়, আদালত ও থানার জীর্ণ কক্ষগুলোতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি মামলার আলামত, যা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবের এক প্রকট উদাহরণ।

পুলিশের সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে মোট ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি জব্দকৃত আলামত ও সম্পত্তি থানা ও আদালতের মালখানায় গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৫ হাজারের বেশি যানবাহন ও জলযান রয়েছে। আদালতের রায় পেতে বিলম্ব, সময়মতো রায়ের অনুলিপি না পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় ডাম্পিং ইয়ার্ড বা আধুনিক মালখানার অভাব এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী।

যেখানে থানার মালখানাগুলোতে ৬ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন, সেখানে আছে মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার বর্গফুট। ফলে নিরুপায় হয়ে থানা বা আদালত ভবনের সামনের করিডোর, গেট, এমনকি ব্যস্ত রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচেই ফেলেরাখা হচ্ছে জব্দ এই মূল্যবান সরকারি সম্পদ। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো এখন প্রায় অকেজো ও অচল হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে উচ্চ আদালত সম্প্রতি নড়েচড়ে বসেছেন। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের বেঞ্চ এ বিষয়ে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন, যাদের দায়িত্ব আগামী দুই মাসের মধ্যে এই মালখানা ব্যবস্থাপনা কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, কেবল আইন করে বা কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ। একটি বিজ্ঞানসম্মত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি এবং জব্দ যানবাহন সংরক্ষণের জন্য আলাদা ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। বিচারকার্য দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে আলামত নষ্ট হওয়া মানেই কেবল সরকারি সম্পদের অপচয় নয়, এটি মামলার গুণগত মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই আলামতগুলোর পাহাড় যেন অচিরেই সরানো যায় এবং মালখানাগুলো যেন একটি আধুনিক আইনি নথিপত্র সংরক্ষাণাগারে পরিণত হয় সেটাই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা।

পুলিশের সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের থানা ও আদালতগুলোর মালখানায় মোট ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি আলামত সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে বড় আকারের সম্পদ হিসেবে রয়েছে ৩৫ হাজার ৫৮৮টি যানবাহন ও জলযান।

দীর্ঘমেয়াদি জট: অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থানায় ১ হাজার ৯৬৪টি এবং আদালতে ১ হাজার ৭৬৪টি যানবাহন পড়ে আছে। অন্যান্য আলামতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও ভয়াবহ; থানায় ৬ হাজার ৮২০টি এবং আদালতে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৭০টি আলামত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধুলোবালি ও অন্ধকারে পড়ে আছে। সারাদেশের থানা ও আদালতের মালখানাগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

জায়গার অভাব: থানাগুলোর মালখানার জন্য প্রয়োজন ৬ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট জায়গা, কিন্তু আছে মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার বর্গফুট। আদালতের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ৫ লাখ ১৯ হাজার ৩৩২ বর্গফুট, সেখানে রয়েছে মাত্র ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ বর্গফুট।

উপযোগিতা: সারাদেশে মোট ৯৬৭টি মালখানার মধ্যে মাত্র ৩৭২টি ব্যবহার উপযোগী। বাকিগুলো জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত অথবা ব্যবহারের অনুপযোগী। সরকারি কোনো নির্দিষ্ট ‘ডাম্পিং ইয়ার্ড’ না থাকায় থানাগুলো চরম বিপাকে আছে। মাত্র ৬টি থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা রয়েছে। বাকি ক্ষেত্রে থানা ভবনের গেটে, চলাচলের রাস্তায় কিংবা খোলা মাঠে এসব গাড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। রোদ-বৃষ্টিতে এসব গাড়ি অকেজো হয়ে পড়ছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা: মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে।

রায়ের অনুলিপি জটিলতা: মামলা শেষ হওয়ার পর আলামত হস্তান্তরের নির্দেশনার কপি সময়মতো পৌঁছায় না। বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার অভাব: মালখানাগুলো আধুনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি নয়। জনবল ও লজিস্টিক সংকট: আলামত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। বিষয়টি আমলে নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের বেঞ্চ গত বুধবার একটি কঠোর আদেশ দিয়েছেন। মালখানা ব্যবস্থাপনা কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, তা পর্যালোচনার জন্য ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-অবকাঠামোগত উন্নয়ন: ১২২টি মালখানা ব্যবহার উপযোগী করা, ৪৯৯টিতে স্থানের সংস্থান করা এবং ৭৪টিকে নতুন করে ব্যবহারের উপযোগী করা। ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ: যানবাহন সংরক্ষণের জন্য আলাদা শেড ও পার্কিং জোন তৈরি করা। সমন্বিত উদ্যোগ: স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, ভূমি, গণপূর্ত এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বাজেট বরাদ্দ ও পরিকল্পনা গ্রহণ। থানা প্রাঙ্গণ কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে অবহেলায় পড়ে থাকা জব্দ যানবাহনের বিশাল ভাগাড়ে। ১৪ লক্ষাধিক আলামতের এই পাহাড় যেন বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক অবকাঠামোর অভাবের এক জীবন্ত দলিল। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো যেভাবে প্রতিদিন অকেজো ও অচল হয়ে পড়ছে, তা কেবল সরকারি সম্পদের অপচয়ই নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথেও এক বড় অন্তরায়।

আলামতের এই জট খুলতে কেবল উচ্চ আদালতের নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বরাষ্ট্র, অর্থ এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা। একটি বিজ্ঞানসম্মত ডিজিটাল ডেটাবেজ, প্রয়োজনীয় ডাম্পিং ইয়ার্ড এবং মালখানা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নই পারে থানা প্রাঙ্গণকে পুনরায় তার প্রশাসনিক ও আইনি মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে।

আলামত সংরক্ষণের এই সংকট নিরসন করে বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করাই হোক আগামীর লক্ষ্য, যেন দেশের প্রতিটি থানা প্রাঙ্গণ আর কখনো এমন বিষণ্ণ ‘ভাগাড়’-এর রূপ না নেয়। হাইকোর্টের বর্তমান উদ্যোগ এবং গঠিত কমিটির সুপারিশসমূহ যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবেই হয়তো এই ‘মালামালের পাহাড়’ থেকে মুক্তি পাবে থানা ও আদালতগুলো। প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে একটি বিজ্ঞানসম্মত ডিজিটাল ডেটাবেজ ও আধুনিক মালখানা তৈরিই এখন সময়ের দাবি।