রাজধানীর অপরাধচক্রের আধিপত্য নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বের বলি হলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন। জামিনে মুক্ত হয়ে ফের সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতেই প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর টার্গেটে পড়েন তিনি। তদন্তে জানা গেছে, মাত্র দুই লাখ টাকার বিনিময়ে পরিকল্পিতভাবে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
বুধবার দুপুরে মিন্টো রোডের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মামুন হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বই এর মূল কারণ।
পুলিশ জানান, মামুন একসময় আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচিত ইমন-মামুন জুটির একজন ছিলেন। ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রনি দীর্ঘদিন ধরেই মামুনকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। বেশ কয়েকবার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, চলতি মাসে হিমেল হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে আসার সময় তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় চক্রটি।
রনির নির্দেশে শুটার হিসেবে নিয়োগ পান ফারুক ও রবিন, যাদের মাধ্যমে মামুনকে গুলি করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য রনি তাঁদের দুই লাখ টাকা পারিশ্রমিক দেন, যা পরবর্তীতে উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার সকালে আদালতের হাজিরা শেষে মামুন বেরিয়ে আসতেই মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবক তাঁর দিকে টানা কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায়, গাড়ি থেকে নামার পরই ৬-৭টি গুলি পড়ে, কয়েক সেকেন্ডেই সব শেষ হয়ে যায়।
হত্যার পর ফারুক ও রবিন রায়েরবাজারের দিকে পালিয়ে যান এবং অস্ত্র রুবেলের মাধ্যমে ইউসুফের কাছে লুকিয়ে রাখেন। অভিযানে অংশ নিয়ে পুলিশ অস্ত্র, গুলি, মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুইজন সরাসরি শুটার, বাকিরা সহযোগী। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আছেন- ফারুক, রবিন, রুবেল, শামীম ও ইউসুফ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে হত্যার পূর্ণ পরিকল্পনা ও টাকা লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা সিলেট হয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু নরসিংদীতে তাদের আটক হয়।
ডিবি কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীতে কয়েকটি অপরাধচক্র আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। কারা কোন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করবে এ নিয়েই খুনোখুনি বেড়েছে। মামুন হত্যার ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ, বলেন অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, এখন থেকে অপরাধচক্রের পুনরুত্থান ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের টাকার বিনিময়ে খুনের প্রবণতা সমাজে ভাড়াটে হত্যার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করছে। তাঁরা মনে করেন, যখন অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া বা দ্রুত জামিন পায়, তখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শহরজুড়ে সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, অপরাধীদের আর্থিক নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করা, জামিনের অপব্যবহার রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, এবং প্রত্যেক থানার গোয়েন্দা সেলের সমন্বয় জোরদার করা।
রাজধানীর বুকে আবারও আলোচনায় এসেছে পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব। মামুন খুনের পর জনমনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কতটা নিরাপদ রাজধানীর সড়ক ও আদালতপাড়া?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, যে কোনো মূল্যে অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়া হবে।
কিন্তু নাগরিকদের প্রত্যাশা প্রতিটি হত্যার বিচার যেন শুধুমাত্র সংবাদ সম্মেলনে থেমে না থেকে আদালতের রায়ে বাস্তবায়িত হয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন