কেরানীগঞ্জে গৃহশিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে ২১ দিন পর মিলল মা-মেয়ের লাশ

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
কেরানীগঞ্জে গৃহশিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে ২১ দিন পর মিলল মা-মেয়ের লাশ

ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। দীর্ঘ ২১ দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে এক স্কুলছাত্রী ও তার মায়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। 

অবাক করার বিষয় হলো, মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়েছে খোদ ওই ছাত্রীর গৃহশিক্ষিকার শোবার ঘরের খাটের নিচ এবং বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই শিক্ষিকা, তাঁর স্বামী ও বোনসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ওরফে ফাতেমা (১৪) এবং তার মা রোকেয়া রহমান (৩২)। ঘাতক শিক্ষিকা মীম বেগমের (২৪) ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া এ জোড়া খুনের ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। 

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে ফাতেমা তার নিয়মিত প্রাইভেট পড়ার জন্য কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকায় মীম বেগমের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে যায়। সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে পড়া শেষ করে সে বাসা থেকে বের হয়, এমনটাই দাবি করেছিলেন শিক্ষিকা মীম। ওই একই সময়ে ফাতেমার মা রোকেয়া রহমানও বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এরপর থেকে মা ও মেয়ের আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। 

পরদিন ২৬ ডিসেম্বর ফাতেমার বাবা শাহীন আহম্মেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরবর্তীতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ৬ জানুয়ারি তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি অপহরণ মামলা করেন।

এলাকাবাসীর বরাতে জানা যায়, গত কয়েক দিন ধরে মুক্তিরবাগ এলাকায় মৃত প্রাণীর পচাগন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। শুরুতে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গন্ধটি অসহনীয় হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা গন্ধের উৎস খুঁজতে খুঁজতে শিক্ষিকা মীম বেগমের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে জড়ো হন। এলাকাবাসী মীমকে দরজা খুলতে বললে তিনি গড়িমসি শুরু করেন এবং দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানান। এতে মানুষের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। 

তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ ফ্ল্যাটে ঢুকে তল্লাশি শুরু করলে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সেই দৃশ্য।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম জানান, তল্লাশির একপর্যায়ে মীমের শোবার ঘরের খাটের নিচে কর্কশিট দিয়ে ঢাকা অবস্থায় রোকেয়া রহমানের অর্ধগলিত লাশ পাওয়া যায়। 

মীম পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে বলেন যে, ফ্ল্যাটে আর কোনো লাশ নেই। কিন্তু পুলিশ পুরো ফ্ল্যাটে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায়। অবশেষে বাথরুমের ফলস ছাদের ভেতর থেকে শিক্ষার্থী ফাতেমার লাশ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘদিন বদ্ধ অবস্থায় থাকায় মরদেহ দুটি প্রায় কঙ্কালসার ও অর্ধগলিত হয়ে পড়েছিল। রাতেই সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নিহত রোকেয়া রহমানের ভাই জাহিদ হোসেন পুলিশের বিরুদ্ধে চরম অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নিখোঁজের পর থেকেই আমরা গৃহশিক্ষিকা মীমকে সন্দেহ করছিলাম এবং পুলিশকে বারবার তা জানিয়েছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কথা গুরুত্ব দেয়নি, বরং সিসিটিভি ফুটেজের দোহাই দিয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছে। আজ ২১ দিন পর আমার বোন আর ভাগনির লাশ পেলাম। 

জাহিদ হোসেন আরও দাবি করেন, ফাতেমা ও তার মায়ের গলায় স্বর্ণের চেইন ছিল। সেই স্বর্ণালঙ্কার লুট করার উদ্দেশ্যেই মীম পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করেছেন বলে তাঁদের ধারণা।

ওসি সাইফুল আলম জানান, নিখোঁজের পর যখন মীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন ফাতেমা সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বের হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজেও এক কিশোরীকে বের হতে দেখা গিয়েছিল, যা পুলিশকে বিভ্রান্ত করে। বর্তমানে মীমসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়েছে। 

আটকরা হলেন, গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম (২৪), মীমের স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮), মীমের বড় বোন নুরজাহান বেগম (৩০) এবং ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী। 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মীম ও তার বড় বোন নুরজাহান এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সিসিটিভি ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে অন্য কোনো কিশোরীকে ফাতেমা সাজিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার ছক কষেছিলেন মীম।

এদিকে, মেধাবী শিক্ষার্থী ফাতেমা ও তার মায়ের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে কালিন্দী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। একজন শিক্ষিকার হাতে ছাত্রীর এমন পরিণতি সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। স্বর্ণালঙ্কার চুরি নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল, তা খতিয়ে দেখতে রিমান্ডের আবেদনসহ আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জেএইচআর