রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সায়েন্স ল্যাব মোড় আজ আবার দেখল এক অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজ এবং ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বিরোধ আজ দুপুরের তপ্ত রোদে আগুনের ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং বাসে ভাঙচুরের ঘটনায় পুরো এলাকা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অচল হয়ে থাকে। পুলিশের টিয়ার শেল আর শিক্ষার্থীদের চিৎকারে মিরপুর-নিউমার্কেট সড়কটি পরিণত হয়েছিল এক খণ্ড রণক্ষেত্রে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কোনো এক অজ্ঞাত তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তজনা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই উত্তেজনা রূপ নেয় সহিংসতায়। দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, চলাচলের পথে থাকা ঢাকা কলেজের একটি শিক্ষার্থী পরিবহনকারী বাসে ভাঙচুর চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা সড়কের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে মিরপুর থেকে নিউমার্কেটগামী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় নিউমার্কেট অঞ্চলের পুলিশ সদস্যরা। তবে উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা ব্যর্থ হলে পুলিশকে কঠোর অবস্থানে যেতে হয়। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে, এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানা গেছে।
অবশেষে দুপুর সোয়া একটার দিকে পুলিশ টিয়ার শেলের (কাঁদানে গ্যাস) কয়েক রাউন্ড সেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটিতে পুনরায় চাকা ঘুরতে শুরু করে যানবাহনের।
এত বড় সংঘর্ষের পেছনে মূল কারণ কী ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন কিংবা কলেজ কর্তৃপক্ষ। পুলিশের নিউ মার্কেট অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিঞ্চার মো. শওকত আলী বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুড়ে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের মধ্যে প্রায়ই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাসে ওঠা বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটে থাকে। তবে আজকের এই প্রকাশ্য সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে আবারও সংকটে ফেলেছে।
সংঘর্ষের কারণে সড়কে আটকা পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল চরমে। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং অফিসগামী মানুষজন তীব্র গরমে বাসের ভেতরে ও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তি পোহান। অনেকে প্রাণের ভয়ে বাস থেকে নেমে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। সায়েন্স ল্যাব মোড়ের দোকানপাটগুলো মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়, ব্যাহত হয় স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম।
বেলা সোয়া একটার পর যান চলাচল শুরু হলেও এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সায়েন্স ল্যাব ও এর আশপাশের পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যেন পুনরায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজ উভয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে দুই কলেজের প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার আঙিনা যখন রাজপথের সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল জনদুর্ভোগই সৃষ্টি করে না, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাজধানীর ব্যস্ততম এই এলাকায় বারবার কেন এমন ঘটনা ঘটছে এবং কারা এর পেছনে উসকানি দিচ্ছে, তা খুঁজে বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা এভাবে বারবার শিক্ষার্থীদের ‘ইগো’র লড়াইয়ে জিম্মি হতে থাকবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন