ফেনীতে ইসলামী স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চাঁদগাজী ভূঁইঞা জামে মসজিদ। জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নের মাটিয়াগোদা গ্রামে ৩২৩ বছরের পূর্বে তৎকালীন সময়ের চুন, সুরকি দিয়ে নির্মিত সুনিপুণ নির্মাণ শৈলী আর বাহারি ডিজাইন এখনও দর্শনার্থী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের কাছে টানে মসজিদটি।
বিশেষ করে রমজান এলেই মসজিদটি এক নজর দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। হিজরি ১১২২ সালের দিকে সুদর্শন মসজিদটি নির্মাণ করেন মোঘল আমলের স্বনামধন্য জমিদার চাঁদগাজী ভূঁঞা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ২৮ শতক জমির ওপর নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৪৮ ফুট এবং প্রস্থ ২৪ ফুট। আর উচ্চতায় রয়েছে ৩৫ ফুট। মসজিদের ছাদের ওপর ৩টি গম্বুজ ও ১২টি সুদৃশ্য মিনার রয়েছে। মাঝখানের গম্বুজটির আয়তনে একটু বড়। গম্বুজগুলোর ওপরে গাছের পাতা ও কলসের নকশা অঙ্কিত রয়েছে। মসজিদে প্রবেশের জন্য মোগল স্থাপত্য নিদর্শনে তৈরি কারুকার্যখচিত দরজাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঠের দরজা তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদের দরজার ওপরে রয়েছে টেরাকোটার নকশা। প্রাচীন মসজিদটির ভেতরে প্রবেশ করলে বিভিন্ন কারুকার্য চোখে পড়ে। মসজিদের সামনে রয়েছে একটি বিশেষ মিনার। যে মিনারে উঠে এক সময় খালি কণ্ঠে আযানের ধ্বনি ছড়িয়ে দিতেন মুয়াজ্জিন। মসজিদের সামনের অংশে শ্বেতপাথরের নামফলকে আরবিতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ও কালেমা তাইয়্যেবা এবং ফারসি ভাষায় কবিতার ছন্দে মসজিদটির নির্মাণকারী ও হিজরি সালের বর্ণনা রয়েছে।
মসজিদের পাশেই ১৮ শতক জুড়ে খনন করা স্বচ্ছ পানিতে নামাজের অযু করেন মুসল্লিরা। পাশেই স্থানীয়দের উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছে একটি মাদ্রাসা। মসজিদটির ভেতরে কয়েকশ মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের বাহিরেও রয়েছে নামাজের জন্য পাকা করা মেঝে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ জুমআর নামাজের পাশাপাশি এখানে ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
জানা যায়, চাঁদগাজী ভূইয়া মসজিদটি ১৯৮৭ সালে প্রত্মতাত্ত্বিক বিভাগের গেজেটভুক্ত হয়। ১৯৯২ সালে প্রাচীন স্থাপত্য হিসেবে ঢাকা কেন্দ্রীয় জাদুঘর থেকে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে মসজিদটির কিছু কিছু অংশের সংস্কারকাজ করা হয়। অর্থসংকটে পুরো সংস্কার করা তখন সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে মসজিদের কিছু সংস্কারকাজ হয়েছিল বলে মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে। তবে বর্তমানে মসজিদটি তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। বর্তমানে এর দেয়াল, গম্বুজ ও ছাদ শেওলা ধরে কালো হয়ে গেছে।
স্থানীয় মহামায়া ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মিুন বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে বর্তমানে মসজিদটিকে ঘষা-মাজা করে রঙের কাজ শুরু হয়েছে। আমার বাড়ি মসজিদের পাশেই। ছোট বেলা থেকেই আমরা মসজিদটি দেখে আসছি। দূর-দূরান্ত থেকেও মসজিদটি দেখতে মানুষজন আসে।
ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম কমল বলেন, দীর্ঘদিন চাঁদগাজী ভূঁইঞা জামে মসজিদটি সংস্কারহীন অবস্থায় ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মসজিদটির সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। সংস্কার কাজ শেষ হলে মসজিদটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
গুগল তথ্য ভাণ্ডার উইকিপিডিয়া সূত্র বলছে, ১৬৩৫ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ফেনীর পূর্বাঞ্চলে একজন স্বনামধন্য জমিদার ছিলেন চাঁদগাজী ভূঞা। তৎকালে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার পশ্চিম দক্ষিণাঞ্চলে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে তিনি প্রচুর ধন, সম্পদ ও লোক লস্কর নিয়ে ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া এলাকায় বসতি স্থাপন করেন।
এরপর মোঘল সম্রাজ্যের সনদপ্রাপ্ত জমিদার রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি একজন ধর্মভীরু মুসলিম ছিলেন। ওই এলাকায় তিনি চাঁদগাজী ভূঁঞা জামে মসজিদ, চাঁদগাজী বাজার, চাঁদগাজী ভূঁইঞা কাছারী বাড়ি স্থাপনসহ নিজের নামে এবং পরিবারের নামে বহু দীঘি খনন করে ইতিহাসে স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
বিআরইউ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন