ভালো নেই ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত মাদারীপুরের শহীদদের পরিবার। কলিজার টুকরো স্বজনদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। নাড়িছেঁড়া ধনের কথা মনে পড়তেই এখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা-বাবা।
অন্যদিকে, পুলিশের গুলিতে চোখ, হাত, পাসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন অন্তত শতাধিক আহত মানুষ। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হতে চললেও এখনো সেই ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন কাটিয়ে উঠতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, দোষীদের দ্রুত বিচার করা হোক, শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখা হোক এবং আহতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে সারা দেশের ন্যায় মাদারীপুরেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন চলাকালে প্রতিদিনই পুলিশ এবং তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। তবে সব বাধা উপেক্ষা করে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে আন্দোলন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা করলে শকুনি লেকপাড়ে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিন আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে মাদারীপুর শকুনি লেকের পানিতে পড়ে প্রথম শহীদ হন মাদারীপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী দীপ্ত দে (২৫)। দীপ্ত দের মৃত্যুতে মাদারীপুর আরও উত্তাল হয়ে ওঠে।
এর পরদিন, ১৯ জুলাই খাগদী এলাকা থেকে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিশাল মিছিল শহরের দিকে আসতে থাকে। মিছিলটি মাদারীপুর সার্বিক পাম্প ও এলজিইডি অফিসের সামনে এলে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় পুলিশের গুলিতে সদর উপজেলার ভদ্রখোলা গ্রামের ওমর আলী বেপারীর ছেলে ট্রাকচালক রোমান বেপারী (২৭) এবং সুচিয়ার ভাঙ্গা গ্রামের মো. সালাউদ্দিন সন্নামাতের ছেলে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী তাওহীদ সন্নামাত (১৯) নিহত হন।
অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হতে চললেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর শোকের মাতম থামেনি। শহীদ দীপ্ত দের বাবা স্বপন দে ও মা মনিকা দে, শহীদ তাওহীদ সন্নামাতের বাবা মো. সালাউদ্দিন সন্নামাত ও মা রেশমা বেগম এবং শহীদ রোমান বেপারীর বাবা ওমর আলী বেপারী ও মা রিনা বেগম সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অন্যদিকে, আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে দৃষ্টিশক্তি ও বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়েছেন জেলার দুই শতাধিক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। আহতদের কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন, কেউ হাত-পা হারিয়েছেন, আবার কেউ সারা শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন। নিজ অর্থায়নে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকেই এখন অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব। ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারিভাবে তাদের সুচিকিৎসার স্থায়ী দায়িত্ব নেওয়া হোক এবং বেঁচে থাকার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়া এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। জানা গেছে, এই বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাদারীপুরে এখন পর্যন্ত তিনটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার অগ্রগতি ও হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন