রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় এক সময়ের গর্ব ও ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামালের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে শত বছরের এই ঐতিহ্য খয়ের শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা যায়, এক সময় খয়ের শিল্প ছিল চারঘাট উপজেলার হাজারও মানুষের জীবিকার উৎস। স্থানীয়ভাবে উপজেলার কয়েকটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই ছিল খয়ের কারখানা। এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণরূপে বদলে গেছে। কয়েক দশক আগে যেখানে প্রায় শতাধিক কারখানা চালু ছিল, বর্তমানে হাতে গোনা ৮-১০টি কারখানা চালু রয়েছে। উপজেলার গোপালপুর, বাবুপাড়া, পিরোজপুর ও আশপাশের গ্রামের খয়ের উৎপাদন ছিল প্রধান পেশা। দেশি পান খাওয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে খয়েরের ছিল অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। চারঘাটের খয়ের গুণগত মান ও স্বাদে সারাদেশে পরিচিত ছিল। এ শিল্পের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি অনেক সমৃদ্ধ ছিল।
খয়ের ব্যবসায়ী আশরাফ বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের সংকট এবং দেশি বাজারে কম দামে বিদেশি খয়ের বাজার দখল করায় একে একে খয়ের কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ হতে শুরু করে। পুঁজি হারিয়ে মূলধন সংকটে রয়েছেন অনেক কারখানার মালিক। চাহিদা কমে যাওয়ায় কেউ কেউ নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগ করে উৎপাদিত খয়ের বাকিতে বিক্রয় করতে বাধ্য হন। ফলে অধিকাংশ কারখানায় মূলধন সংকট দেখা দিলেও সরকারি সহযোগিতা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
উৎপাদক ও খয়ের সমিতির সদস্য এনামুল হক অভিযোগ করে বলেন, খয়ের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখনও কোনো সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ঋণ, প্রশিক্ষণ বা বিপণন সহায়তা কিছুই মেলে না। তাই এই শিল্পকে পুনর্জীবিত করতে দরকার সরকারি সহযোগিতা। পাশাপাশি স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ, সরকারি উদ্যোগে খয়ের গাছ লাগানো ও খয়ের আমদানিকারকদের নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান আমলে বিহারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় চারঘাটের খয়ের শিল্প। এ শিল্পের একমাত্র কাঁচামাল খয়ের গাছ উপজেলার বিভিন্ন জঙ্গলে ও চাষযোগ্য জমিতে উৎপাদিত হতো। তুলনামূলক দাম কম ও সহজলভ্য হওয়ায় এই শিল্পটি চারঘাট উপজেলায় গড়ে উঠে। পাশাপাশি নাটোরের আব্দুলপুর, লালপুর, বাগাতিপাড়া ও লোকমানপুর এলাকা থেকেও কাঁচামাল হিসেবে এই খয়ের গাছ গরুর গাড়িতে করে বয়ে এনে চারঘাট বাজারে বিক্রয় হতো। উৎপাদিত খয়ের ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রয় হতো।
খয়ের কারখানার কারিগর ঝিকরা গ্রামের সাইফুল বলেন, আমাদের কয়েক প্রজন্ম এই পেশায় ছিলেন। আমিও প্রায় ৪০ বছর ধরে খয়ের তৈরি করছি। এই শিল্পে আয় একেবারেই সীমিত। নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। কারখানার মালিক তাসফিয়া বলেন, একসময় এই খয়ের বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি স্বাবলম্বী হয়েছি। তবে এখন অনেক সময় উৎপাদন খরচও উঠে না।
এ বিষয়ে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আব্দুল মুকিম বলেন, খয়ের উৎপাদনকারী কারখানা সমিতি নামে সমবায় রেজিস্ট্রেশন রয়েছে, তবে বর্তমানে তা অকার্যকর। উপজেলার সমবায়ের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার কোনো সুযোগ নেই, তবে এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে বলে জানান তিনি।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন