মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের দূর্গম চর পাটগ্রামে নাদিয়া আক্তার বৃষ্টির জন্ম দরিদ্র এক জেলে পরিবারে। বৃষ্টি তার ডাক নাম। দুইবোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে বৃষ্টি সবার বড়। ছোটোবেলা থেকেই দরিদ্র জেলের ঘরে জন্ম নেয়া বৃষ্টির দিন যেন অন্যান্য পরিবারের ছেলে মেয়ের মতই চলছিল হাসি আনন্দে। অল্প বয়সে হাস্যোজ্জ্বল বৃষ্টি পদ্মার চরাঞ্চলে খেতে খামারে খেলাধুলায় মেতে থাকতো প্রতিদিন।
বৃষ্টির দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় লেখাপড়া ততটা এগোয়নি। বাবার অভাবের সংসারে হাসির আড়ালে ভয়ংকর অদৃশ্য ছোবলে বৃষ্টির দিন এলোমেলো হতে শুরু করলো বাল্য বিবাহতে। অভাবের সংসারে ছেলে মেয়েদের ভরণপোষনে হিমশিম খেতো বৃষ্টির বাবা। বাধ্য হয়ে ছয় সাত বছর পূর্বে সামাজিকভাবে উঠতি বয়সেই বাল্য বিবাহ যেন ঘোর অন্ধকার নেমে এলো বৃষ্টির জীবনে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১২/১৩ বছর বয়সে বৃষ্টির বিয়ে দেওয়া হয় একই উপজেলার বয়ড়া ইউনিয়নের খালপাড় গ্রামের কাউসারের সাথে। অপ্রাপ্ত বয়সে সংসার আর খুঁটিনাটি ঝগড়া লেগেই থাকতো বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে স্বামীর বাড়ির আশপাশের লোকজনের ভাষ্যমতে, বৃষ্টি ছিলো শান্ত স্বভাবের। এক পর্যায়ে বৃষ্টির বিবাহ বিচ্ছেদ হয় অন্য কারো সাথে সম্পর্কের অভিযোগে। দেনমোহরের লক্ষাধিক টাকাসহ ৪/৫ লক্ষ টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ করেছে বৃষ্টির শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা। বিবাহ বিচ্ছেদের পর হঠাৎ উধাও হয়ে যায় বৃষ্টি। এমনকি বাবার সংসারের কারোর সাথে নাকি বৃষ্টির কোন রকম যোগাযোগই ছিলো না বলে জানা গেছে।
গ্রামে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে বৃষ্টির চেহারা সুরুত (শ্যামলা) তেমনটা ভালো ছিলো না বলে অনেকেই উপহাস করতো। পূর্বে পুর্বে আবার হঠাৎ আন্ধারমানিক ট্রলার ঘাট দিয়ে বৃষ্টি চরাঞ্চলে নানির বাড়িতে আসছিলো বলে অনেকেই দেখেছেন। তখন বৃষ্টির চেহারা সুরুত আর এমন পরিবর্তন দেখে অনেকেই অবাক। গ্রামের সহজ সরল বৃষ্টির এমন হঠাৎ পরিবর্তন দেখে অনেকেই চতুর বৃষ্টির নতুন পরিচয় শুরু হয়। এমন হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি কারো কথা শুনতো না। এমনকি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিতো।
এছারা, বৃষ্টির একাধিক ফেসবুক আইডির স্ট্যাটাস থেকে তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, সমাজের প্রতি তার অদৃশ্য কারণ আর ঘৃণার ছবি, ভিডিও স্পষ্ট ফুটে উঠেছেন। বৃষ্টির বেশ কয়েকটি ফেসবুক আইডি হতে ভাল খারাপ মিলে মাঝে মাঝে পোস্ট দেখা যেতো। গ্রামের সহজ সরল দরিদ্র জেলের ঘরে জন্ম নেয়া বৃষ্টি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবে, কখন, কীভাবে এমন অন্ধকার জগতে গেলো, সেটা সবার মনে প্রশ্ন জেগেছে।
বৃষ্টির বাবার পাশের বাড়ির লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টি শান্ত স্বভাবের ছিলো। পরিবারের অভাবের কারণে হয়ত এমন হতো পারে বলে তার পরিবার আর অনেকেই ধারণা করছে।
তবে বৃষ্টির শ্বশুরবাড়ির আশপাশের লোকজন এমনকি পরিচিতজনদের মধ্যে শাহিন, হাসেম, ফরহাদ, নাসির জানান, বৃষ্টি শান্ত স্বভাবের ছিলো। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের সাথে মাঝে মাঝে পারাবারিক ঝামেলা চলতো। তার পরকীয়ার অভিযোগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এমনকি দেনমোহরের টাকাসহ পাঁচ লক্ষাধিক টাকার উপরে শ্বশুরবাড়ির ক্ষতিসাধন করে বলে জানা গেছে।
এরপর বৃষ্টিকে এলাকায় কেউ দেখেনি। হঠাৎ উধাও বৃষ্টির ছবি আর নিউজ দেখে অনেকেই চিনতে পারেনি। কারণ বৃষ্টির চেহাসুরুতের এমন পরিবর্তন আর চলাফেরার ধরনে হতবাক সবাই।
আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত নাদিয়া আক্তার বৃষ্টিসহ বাংলাদেশি যুগলকে রোববার (১৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে বান্দরবান জেলা থেকে তাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেপ্তার কৃতরা হলেন মুহাম্মদ আজিম (২৮) ও বৃষ্টি (২৮)।
এর মধ্যে আজিমের বাড়ি চট্টগ্রামে, আর বৃষ্টির বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের পাটগ্রাম।
তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে সিআইডি।
বৃষ্টির বাবার সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমি যখন জেলে ছিলাম, মাছ মেরে সংসার চালাতাম। তখন বৃষ্টির জন্ম হয়। এখন আমি চা এর দোকান করি। আমার মেয়ে আমার কথা, পরিবারের কথা শোনেনি কখনো। তাকে মেয়ে পরিচয় দিতে আমার কষ্ট হয়। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে বৃষ্টি বড়। ৫/৬ বছর পুর্বে খালপাড় এলাকার কালার ছেলে কাউসারের বিবাহ হয়। মেয়েকে বলেছিলাম- কষ্ট হলেও সংসার করতে। কিন্ত মেয়ে শোনেনি। অভাবের সংসারে বিবাহ বিচ্ছেদের পর সমাজের বোঝা মনে হয়ত বৃষ্টি আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিছে। কিছুদিন পর স্বামীর সাথে ঝামেলা হয়ে মেয়ে কোথায় গেছে জানিনা। আমি আমার মেয়েকে ত্যাজ্য করেছি অনেক আগেই। তাকে আর মেয়ে হিসেবে পরিচয় দেই না।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন