নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, আর্থিক দুর্নীতি ও দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলে কুষ্টিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক নগরী এন.এস. রোডে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার সকাল ১১টায় সিভিল সার্জন কার্যালয় ঘেরাও ও প্রতিবাদ সভা করে স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠনগুলো।
আন্দোলনকারীরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে স্থায়ী বহিষ্কার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুততর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি করেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এনসিপি কুষ্টিয়া জেলা কমিটির আহ্বায়ক জান্নাতুল ফেরদৌস তনি, আপ বাংলাদেশ কেন্দ্র কমিটির নেতা সুলতান মারুফ তালহা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাবেক সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, কুষ্টিয়া শহর শিবিরের সেক্রেটারি হাফেজ আব্দুল আল মামুন, দৈনিক কুষ্টিয়ার নির্বাহী সম্পাদক ও বৈষম্যবিরোধী নেতা আলী মুজাহিদসহ অন্যান্য নেতা-কর্মীরা।
তারা বলেন, এই নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে তাদের আন্দোলন তীব্রতর করা হবে।
প্রতিবাদ সংগঠনের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত দাবিসমূহের মূল পয়েন্টগুলো ছিল—
১) নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকলকে শনাক্ত করে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
২) দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩) বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া।
এ সময় আন্দোলনকারীরা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও কঠোর এবং তীব্র কর্মসূচি ঘোষণা করার হুমকিও দেন।
কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. কামাল হোসেন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জানান, “আমরা সরকারি চাকরি করি, আমাদের কিছু রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন আছে, এগুলোর বাইরে আমরা কিছু করতে পারব না। আপনাদের দাবির বিষয়টি ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে—আগামী তিন দিনের মধ্যে আমরা যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব। ইতিমধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি নিয়োগে নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে এই প্রতিবাদ সভায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যুক্ত হন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। আন্দোলনের অঙ্গীকার অনুযায়ী দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের কর্মসূচি আরও বাড়ানো হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও তদন্ত সংস্থার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে দলের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি এখনও অনড় তদন্তাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষিত তিন দিনের সময়সীমার মধ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার দিন একটি বাসা থেকে ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর বের হওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়া প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
চিঠিতে বলা হয়, ২৪ অক্টোবর কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং এর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ১১-২০ গ্রেডের ১১৫টি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের লক্ষ্যে লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। বিদ্যমান নিয়োগ বিধির আলোকে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক যথাযথভাবে সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রেখে অত্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশে কুষ্টিয়া শহরের ১৪টি কেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আপ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য সুলতান মারুফ তালহা বলেন, শনিবার দুপুরে সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান ফটকে তালা লাগানো হয়েছে। নিয়োগ বাতিল করা না হলে, ততক্ষণ তালা লাগানো থাকবে। তবে ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে কে বা কারা ওই গেটের তালা ভেঙে ফেলে।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৬ অক্টোবর এই ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণা করা ছিল। কিন্তু জানতে পারলাম, দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই আজকে তড়িঘড়ি করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এ জন্য তাৎক্ষণিক এই কর্মসূচি ঘোষণা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, আজকের মধ্যেই ওই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল ও নতুন পরীক্ষার ঘোষণা দিতে হবে।
সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পাঁচ সদস্যের কমিটি আছে। সেখানে তিনি সদস্যসচিব। পরীক্ষার আগের রাতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি কক্ষে সব সদস্য মিলে প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। প্রশ্নপত্র ফটোকপি-সংক্রান্ত কাজে আরও কয়েকজন ছিলেন। যাঁরা প্রশ্নপত্র তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সবার ফোন ক্লোজ করে রাখা হয়। প্রশ্নপত্র বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
শুক্রবার সকাল আটটার পর প্রশ্নপত্র কেন্দ্রগুলোয় পাঠানো হয়। আর আরএমও নিয়োগ–সংশ্লিষ্ট কোনো কাজে জড়িত নন। যে অভিযোগ আসছে, তা পুলিশ তদন্ত করতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও হোসেন ইমাম বলেন, তাঁর বাসায় বিভিন্ন নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা মেস ভাড়া করে থাকেন। সেখান থেকে এসব শিক্ষার্থীকে বের হতে দেখে অনেকে বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন। তিনি ওই নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে কিছু জানেন না।
এদিকে ২৫ অক্টোবর কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন অফিসের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জনবল নিয়োগ কার্যক্রম অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন