বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়সহ বিস্তৃত জলাশয় একসময় ছিল মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, জলাশয় ভরাট, দূষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নদীর নাব্যতা হ্রাস, কৃষি কীটনাশকের ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে আসছে। একসময় যেখানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ আহরিত হতো মুক্ত জলাশয় থেকে, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৯ শতাংশে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) টেকসই মৎস্য উৎপাদনে, জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় ও বিদেশি মাছের জিনগত উন্নয়ন, নির্বাচনি প্রজনন (Selective Breeding) ও কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন উন্নত জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে।
বিএফআরআই-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হারুনর রশিদ বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দেশীয় মাছের কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছি, যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এতে মৎস্যচাষিরা সরাসরি লাভবান হচ্ছেন।
ইতোমধ্যে বিএফআরআই-এর উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলোর মধ্যে, সুবর্ণ রুই (৫ম প্রজন্ম) স্থানীয় জাতের তুলনায় ২৭% বেশি উৎপাদনশীল, রাজ পুঁটি (৬ষ্ঠ প্রজন্ম) ৩৬% বেশি, কাতলাবাউস (২য় প্রজন্ম) ৪.১৭% বেশি উৎপাদন দেয়, এবং GIFT তেলাপিয়া (১৩তম প্রজন্ম) প্রচলিত জাতের তুলনায় ৬২% বেশি উৎপাদনশীল।
বিএফআরআই গবেষণাগারে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক মলিকুলার মার্কার প্রযুক্তি (RAPD, microsatellite, mtDNA), যা মাছের জিনগত কাঠামো, ইনব্রিডিং শনাক্তকরণ ও উন্নত জাত নির্বাচনে সহায়তা করছে। পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংরক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ‘ফিশ জিন ব্যাংক’, যেখানে মূল্যবান দেশীয় প্রজাতির জিনগত সম্পদ সংরক্ষিত হচ্ছে।
ড. মো. হারুনর রশিদ আরও বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা শুধু উৎপাদন বাড়াচ্ছি না, বরং টেকসই মৎস্যচাষের ভিত্তিও মজবুত করছি। উন্নত জাতের মাছ ব্যবহার করলে চাষিরা কম খরচে বেশি উৎপাদন পাবেন এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএফআরআই–এর এ উদ্যোগ জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। উন্নত জাতের মাছ চাষ সম্প্রসারিত হলে মৎস্য উৎপাদন আরও বাড়বে, বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমলেও চাষে উৎপাদন বাড়াচ্ছে উন্নত জাতের মাছ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন