জীবনের প্রতিটি সফল মানুষই নিজের গল্প নিজেই লেখেন। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক সেই মানুষদের একজন, যিনি চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সামলে নিচ্ছেন দৌড়ের অদম্য নেশা। আর সেই নেশার কারণেই তিনি আজ একজন সফল দীর্ঘ দূরত্বের রানার ও আল্ট্রা ম্যারাথন দৌড়বিদ। দৌড়ের পাশাপাশি তিনি একজন ট্রেকার, মাউন্টেনার! সে গল্প না হয় আরেকদিন।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জে ‘দ্য অ্যাথলেট এক্স’ আয়োজিত আল্ট্রা ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় ৫০ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে সারা দেশের প্রায় ১৪১ প্রতিযোগীর মধ্যে সফলভাবে ফিনিশ করে অর্জন করেছেন সম্মানজনক ফিনিশার মেডেল। দৌড় শেষে হাসিমুখে মেডেল গ্রহণের মুহূর্তটি যেন তাঁর কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও মানসিক দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল চিত্র।
আরও সম্প্রতি খাগড়াছড়ি এর পাহাড়ি এলাকায় Albatross Ultrail ও Run Bangladesh আয়োজিত বাংলাদেশের প্রথম ট্রেইল ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় ৩৩ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে সারা দেশের প্রায় ১৫০ প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি কৃতিত্বের সাথে ৩য় স্থান অর্জন করেন। পাহাড়ি এই ট্রেইল রান UTMB ও ITRA (ট্রেইল রানের বিশ্ববিখ্যাত অর্গানাইজেশন) সমর্থিত আল্ট্রা রান।
ছবিতে দেখা যায় দীর্ঘ পথ দৌড়ে এসে ক্লান্ত হলেও তাঁর মুখে এক তৃপ্তির হাসি। আয়োজকের হাতে যখন মেডেলটি গলায় পরানো হয়, তখন যেন প্রমাণ হয়ে যায় যে মানুষ নিজেকে বিশ্বাস করে, তাকে থামানো যায় না।
২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন ডাক্তার সৈকত। বর্তমানে তিনি বাগাতিপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি পদে দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি প্রতিদিন ইনডোর ও আউটডোরে সততা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে রোগী দেখেন।
চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি নিজের যোগ্যতা বাড়াতে তিনি মেডিসিনে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করার জন্য ফাইনাল পার্ট পরীক্ষা দিচ্ছেন, যা তাঁর নিয়মিত পরিশ্রম ও পেশার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ।
ছোটোবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর সখ্য। কিন্তু ২০১৬ সালে বেশি BMI এর কারণে হাটুর ব্যথা দেখা দিলে তিনি ওজন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে চিন্তা শুরু করেন। পরবর্তীতে তারই বন্ধুকে দেখে উৎসাহিত হয়ে ২০১৮ সাল থেকে তিনি নিজের জন্য নতুন পথ বেছে নিলেন নিয়মিত দৌড়।
ধীরে ধীরে দৌড় তাঁর BMI কমিয়ে শরীরকে শুধু সুস্থ করল না, বরং গড়ে তুলল এক নতুন মানুষ হিসেবে। ২০১৮ থেকে দৌড়ের পথ ৫০ এর অধিক 'দীর্ঘ দূরত্বের দৌঁড়' এর নায়ক।
প্রথম দিকে স্বল্প দূরত্বের দৌঁড় শুরু করেন। ২০২১ সাল থেকে তিনি নিয়মিত দীর্ঘ দূরত্বের দৌঁড় যেমন: আল্ট্রা ম্যারাথন, ৩৩ কিমি রান, ২৫ কিলো রান, হাফ ম্যারাথন, ১০ কিমি রান সহ নানা ধরনের দৌঁড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু করেন।
এ পর্যন্ত ৫০ এর অধিক দীর্ঘ দূরত্বের দৌঁড়, যার মধ্যে চারটি সফল আল্ট্রা ম্যারাথন সম্পন্ন করেছেন। ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর তিনি নিয়মিত এই ধরনের আল্ট্রা ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করছেন এবং সবক’টি ইভেন্টেই সফলভাবে ফিনিশ করেছেন তিনি।
চিকিৎসকের ব্যস্ত কর্মঘণ্টা, পরিবারের দায়িত্ব সবকিছুর মাঝেও তিনি সময় বের করেন অনুশীলনের জন্য। ভোরের আলো ফোটার আগে তাঁর দিন শুরু হয় দৌড় দিয়ে।
দৌড় তাঁকে শুধু ফিট করেনি মন ও মানসিকতাকে করেছে শক্ত। ডা. সৈকত বলেন, দৌড় আমার জীবন বদলে দিয়েছে। শারীরিক ব্যথা আমাকে থামাতে পারেনি, বরং দৌড় আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তাঁর এই দৌড় যেন একই সঙ্গে সুস্থতা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য বার্তা।
যেখানে অনেকেই ব্যথা বা সমস্যাকে অজুহাত বানিয়ে জীবন থেকে পিছিয়ে যান, সেখানে ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক নিজের জীবনে নতুন অধ্যায় লিখেছেন নিজেকে বদলে ফেলার, সুস্থ থাকার ও অন্যদের অনুপ্রাণিত করার অধ্যায়।
বাগাতিপাড়া উপজেলার এই চিকিৎসক একজন দৌড়বিদের চেয়ে বেশি তিনি এক অনুপ্রেরণা, যিনি দেখিয়ে দিয়েছেন- জীবন যত কঠিনই হোক, দৌড় থামিয়ে দিলে চলবে না।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন