ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রদল নেতা হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক দল আহ্বায়কসহ দুজন গ্রেপ্তার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ১১:২৬ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রদল নেতা হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক দল আহ্বায়কসহ দুজন গ্রেপ্তার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাদ্দাম হোসেন হত্যাকাণ্ড মামলায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন দীলিপ (৪৯) এবং তার সহযোগী বাবুল মিয়াকে (৩৩) কে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। 

রাজধানীর সবুজবাগ থানার অন্তর্গত বাসাবো এলাকায় রবিবার রাতে বিশেষ অভিযানে তাদের আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চলা বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়, যা এলাকায় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে। 

র‌্যাব–৯ নিশ্চিত করে জানায়, তাদের সিপিসি–১ এবং র‌্যাব–৩ এর একটি সমন্বিত দল গোপন সূত্রে দীলিপ ও বাবুলের অবস্থান জানতে পারে। পরবর্তীতে রাত ১০টার দিকে অভিযান পরিচালনা করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে. এম. শহিদুল ইসলাম সোহাগ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুইটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে একটি সদর উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল সিকদারের নেতৃত্বে, অপরটি জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন দীলিপের নেতৃত্বে। এলাকাবাসীর মতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ চলে আসছিল। এই উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় গত ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় কান্দিপাড়া মাদ্রাসা রোডে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। 

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, শাকিল সিকদারের অনুসারীরা হঠাৎ করেই দীলিপের গ্রুপের ওপর গুলি চালায়। ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়।

এ গোলাগুলির কয়েক ঘণ্টা পর, একই রাতের গভীরতায়, কান্দিপাড়ার মাইমলহাটির নিজ বাড়ি থেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাদ্দাম হোসেনকে ডেকে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পরই তাকে গুলি করে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের পরিবার সরাসরি অভিযোগ এনে বলে দেলোয়ার হোসেন দীলিপ ও তার সহচররা পরিকল্পিতভাবে সাদ্দামকে হত্যা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ওপর নেমে আসে শোকের ছায়া। তার স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে এলাকায় গভীর সহানুভূতির পরশ দেখা দেয়। স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হয়েছে সাদ্দাম।

২৮ নভেম্বর নিহত সাদ্দামের বাবা মোস্তফা কামাল ওরফে মস্তু মিয়া সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দেলোয়ার হোসেন দীলিপকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ছাড়া আরও ছয়জনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে: বাবুল মিয়া (২৮), সাদিল মিয়া (৩৫), পলাশ মিয়া (৩৫), টিটন মিয়া (৩৪), বাপ্পা মিয়া (২৬) ও কাজল মিয়া (৪৫)। 

এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫-৭ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার পর থেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে বেশ কয়েকজন আসামি এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন বলে র‌্যাবের দাবি।

মামলা হওয়ার পর র‌্যাব–৯ দ্রুত ছায়া তদন্ত শুরু করে। ঘটনার স্থান, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নজরদারিও চালানো হয়। র‌্যাব জানায়, বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত হাতে আসার পর স্পষ্ট হয় যে দীলিপ ও তার সহযোগী বাবুল ঢাকায় অবস্থান করছেন। এরপর পরিকল্পিতভাবে ঢাকার বাসাবো এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় দীলিপের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও র‌্যাব সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

গ্রেপ্তারের পর সোমবার বেলা ১২টার দিকে দীলিপ ও বাবুল মিয়াকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে তোলা হয়। সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, তদন্ত এগিয়ে নিতে দুই আসামির ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। আদালত শুনানি শেষে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওসি আরও জানান, দীলিপের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৯টি মামলা রয়েছে যার বেশিরভাগই হামলা, দাঙ্গা, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ঘটনার পর কান্দিপাড়া এলাকায় প্রচণ্ড উত্তেজনা বিরাজ করছে। বহু মানুষ এখনো এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ছোটখাটো বিরোধের জেরে এ ধরনের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড বন্ধে রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। নিহত সাদ্দাম হোসেনের পরিবার দ্রুত বিচার দাবি করেছে। তাদের কথায় আমরা চাই, যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তারা যাতে কোনোভাবেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হতে না পারে। 

র‌্যাব–৯ জানিয়েছে, মামলার বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে। সংগৃহীত তথ্য, ফোন কল রেকর্ড, অবস্থানগত উপাত্তসহ প্রযুক্তিগত বিভিন্ন উপাত্ত যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার কাজ চলছে।

ইএইচ