বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে নির্মিত বক্স কালভার্টগুলোতে উদ্বোধনের আগেই ফাটল ধরেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
নির্মাণাধীন কালভার্ট ব্রিজ হস্তান্তরের আগেই ফাটল শিরোনামে বেশ কিছু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ছয় মাস যেতে না যেতেই ফের আর একটি ব্রিজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।
সর্বশেষ উপজেলার দক্ষিণ রফিয়াদি কালু মাঝির বাড়ির সামনের খালে নির্মাণ করা কালভার্ট (বক্স কালভার্ট) নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কালভার্ট ব্রিজটি হস্তান্তর করার আগেই কালভার্টটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরায় ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ওই এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় উপজেলার দক্ষিণ রফিয়াদি কালু মাঝির বাড়ির সামনের খালে নির্মাণ করা কালভার্টটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, উদ্বোধনের আগেই কালভার্টের গাইড ওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিষয়টি স্থানীয়রা জানাজানির পর হুড়োহুড়ি করে মাটি দিয়ে ফাটল ঢেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে এলাকাবাসী।
অন্যদিকে নির্মাণাধীন ব্রিজ হস্তান্তরের আগেই ফাটল দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা শাহীন সহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কালভার্ট ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। কালভার্ট ব্রিজটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর ও ব্রিজের কাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ব্রিজটির দু’পাশের সাইড ওয়ালে ফাটল ধরেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ করে আরও বলেন, ব্রিজ নির্মাণ করার সময় কাজের অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স পি.এম.এ. এন্টারপ্রাইজ। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার দক্ষিণ রফিয়াদি গ্রামের বাসিন্দা সহ আশপাশের ৩/৪টি গ্রামের বাসিন্দারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি ভাঙ্গা লোহার পোল পারাপার করেই চলাচল করতে হতো তাদের।
তবে স্থানীয়দের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সেতু/কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প-এর মাধ্যমে উপজেলার দক্ষিণ রফিয়াদি কালু মাঝির বাড়ির সামনের খালের উপর ৯ দশমিক ১৫ মিটার সেতু/কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৩৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৯ শ’ ৫০ টাকা ব্যয় করে একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য মেসার্স পি.এম.এ. এন্টারপ্রাইজ নামে প্রতিষ্ঠান কাজটি পান।
স্থানীয় কবির বলেন, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করার সময়ই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় আমরা এলাকাবাসী এক হয়ে এর প্রতিবাদ করলে ঠিকাদার বিষয়টি আমরা দেখে বাবুগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে জানালে তারা ঘটনাস্থলে এসে পরিদর্শন করে যায়। কিন্তু তার পরে উল্লেখিত কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স পি.এম.এ. এন্টারপ্রাইজ এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই তাদের অধিকাংশ বিল পরিশোধ করে দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।
স্থানীয় বিএনপির কর্মী লাভু বলেন, কালভার্টটি নির্মাণ করার সময় তারা প্রতিবাদ করলে ঠিকাদার ও তার লোকজন তাদের লাঞ্ছিত করেন। অভিযোগ করে তারা আরো বলেন, কাজে অনিয়ম হচ্ছে বিষয়টি প্রকল্প কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানালেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো তারা ঠিকাদার কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছেন। প্রকল্প অফিসার অর্থের বিনিময়ে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বা কাজ বন্ধ রাখেনি। কারণ হচ্ছে অর্থের কাছে প্রকল্প অফিসার বিক্রি হয়েছেন। তাই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই কাজের অধিকাংশ বিল পরিশোধ করেছেন।
তবে আমাদের স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই যে, কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানোর পরে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পরেও কেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কাজের বিল এবং কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন! এটাই আমরা জানতে চাই। তারা আরো বলেন, তাহলে কি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থের লোভে নিশ্চুপ!
উল্লেখ্য, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চাঁদপাশা ইউনিয়নের ডিক্রিরচর গ্রামে নির্মাণাধীন ৪০ লাখ টাকা মূল্যের কালভার্ট (বক্স কালভার্ট) নির্মাণেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরও সেখানেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা।
এছাড়া ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেনের বিরুদ্ধে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেনের কমিশন না দিলে কোনো কাজ করা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সম্ভব নয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠার মালিকরা।
এছাড়াও গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা), কাবিখা/কাবিটা/টিআর (সাধারণ ও বিশেষ), অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি, ভিজিএফ কর্মসূচি, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ (জিআর, ক্যাশ, শুকনা খাবার, খাদ্যশস্য, ঢেউটিন, তাবু বিতরণ), সেতু কালভার্ট নির্মাণ কাজে যে বরাদ্দ বাবুগঞ্জ উপজেলায় দেওয়া হয় সেগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। যেমন, প্রকল্প কর্মকর্তাকে ঘুষ দিলেই অনিয়ম হয়ে যায় নিয়ম।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সোহেল হোসেনের অনিয়মের কারণেই একের পর এক প্রকল্পের নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অর্থ দিয়েই প্রকল্পের কাজগুলো নিতে হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক ব্যক্তি।
প্রকল্প কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেনের মুঠো ফোনে তিন দিন ধরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেনি। পরে প্রতিবেদক তার কার্যালয়ে গিয়ে বক্তব্য এবং নিউজের তথ্য চাইলে তিনি না দিয়ে বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি করছি ঠিক আছে। আপনি নিউজ করেন। আমি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেবো না। যা করার তা আপনি করেন।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কালভার্ট নির্মাণ কাজে কোনো অনিয়ম হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এবং তদন্ত করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, কাজ হস্তান্তরের আগে নির্মাণাধীন কালভার্টে ফাটল দেখা দিলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে। পাশাপাশি কাজ হস্তান্তরের আগে ফাটল দেখা গেলে প্রয়োজনে সেটা ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন বলেন, কালভার্ট ব্রিজ নির্মাণে যদি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকে তাহলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, কোনো অনিয়মকে ছাড় নয়। অভিযোগ পেলেই সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, এর আগেও একই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার প্রকল্পের অধীনে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা কালভার্টও নামে মাত্র করা হয়েছে। সেগুলোতেও অসংখ্য ফাটল রয়েছে। তবে স্থানীয়রা এবার তাকিয়ে রয়েছে নবাগত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার কী ব্যবস্থা নেন, সেদিকে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন