ভুয়া সনদে ২২ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন নুরুজ্জামান

মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৭:০৭ পিএম
ভুয়া সনদে ২২ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন নুরুজ্জামান

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগে ২২ বছর ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ভুয়া বিএড সনদ প্রদর্শন করে উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে তার নিয়োগকালে তৎকালীন জনবল কাঠামোতে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকের কোনো পদ ছিল না। জনবল কাঠামো বহির্ভূতভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করায় তার নিয়োগকে শুরু থেকেই অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। 

এ ছাড়া বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থেকেও বিধিবহির্ভূতভাবে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড সনদ অর্জন করে উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন তিনি।

এসব অনিয়মের কারণে ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) রিপোর্টে মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের নিয়োগ অবৈধ উল্লেখ করা হয়। ওই রিপোর্টে তৎকালীন সময় পর্যন্ত উচ্চতর স্কেলে প্রাপ্ত সকল সরকারি অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

শিক্ষা পরিদর্শক মো. আব্দুস সালাম আজাদ ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই পরিদর্শন রিপোর্টটি ২০১৮ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ২০০৩ সালের ১৩ মে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তার ইনডেক্স নম্বর- ১০০৩৯৩৮। অথচ ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবরের জনবল কাঠামো অনুযায়ী ওই বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষকের পদ ছিল না। পদ ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করায় তাঁর নিয়োগটি বিধি মোতাবেক হয়নি।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, নুরুজ্জামান ২০০৮ সালে চাকৃতিরত অবস্থায় ঢাকার শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময়কালে তিনি কোনো শিক্ষা ছুটি নেননি এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন, যা চাকুরি বিধিমালা পরিপন্থী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, বিএড প্রশিক্ষণ সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড করায় তিনি উচ্চতর স্কেল পাওয়ার যোগ্য নন। ফলে ২০০৯ সাল থেকে উচ্চতর স্কেলে নেওয়া সমস্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ জাহান উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর স্বামী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র লতিফুর রহমান রতন দীর্ঘ বছর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক হওয়ায় ডিআইএ-এর পরিদর্শন রিপোর্টটি আমলে নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, "এমন সমস্যা শুধু আমার একার নয়, আরও কয়েকজন শিক্ষকেরও রয়েছে। অডিট কর্মকর্তাদের অন্যায় আবদার পূরণ না করায় তারা ইচ্ছামতো রিপোর্ট লিখে দিয়েছেন। আমরা জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে এর জবাব পাঠিয়েছি।"

প্রধান শিক্ষক মমতাজ জাহান জানান, রিপোর্টে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সমস্যার কথা আছে এবং আপত্তির বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, "অডিট রিপোর্টটি দেখার পাশাপাশি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" 

নেত্রকোণা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবির আহাম্মদও বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

ইএইচ