ওপারে যুদ্ধ, এপারে ভীতি   

টেকনাফ সীমান্তে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, ঘর ছাড়ছেন স্থানীয়রা

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি  প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
টেকনাফ সীমান্তে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, ঘর ছাড়ছেন স্থানীয়রা

কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যং লম্বাবিল এলাকাটি এখন এক ভূতুড়ে জনপদে পরিণত হয়েছে। কোনো ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা, কোনো ঘরে কেবল পুরুষ সদস্যটি মালামাল পাহারায় বসে আছেন, আর পরিবারের নারী ও শিশুদের পাঠিয়ে দিয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের ওপার থেকে আসা লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি আর মাইন বিস্ফোরণে সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতির সঞ্চার সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ এখন নিজের শোবার ঘরেও নিরাপদ বোধ করছে না। 

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে লম্বাবিল তেচ্ছি ব্রিজ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় থমথমে পরিস্থিতি। সীমান্তের দূরত্ব তিন কিলোমিটার হলেও মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর গোলাগুলি এখন সরাসরি এপারের ঘরবাড়িতে আঘাত হানছে। গতকাল সকালে আবু তাহের ও জোছনা আক্তারের ঘরে জানালা ভেদ করে গুলি ঢুকে পড়ে। ভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত না হলেও দেয়ালের ছোপ ছোপ চিহ্ন আর জানালার কাঁচের টুকরো সাক্ষ্য দিচ্ছে ভয়াবহতার।

আতঙ্কে ইতিমধ্যে আবুল কালাম, আমির হোসেন ও আনোয়ারুল ইসলামসহ অন্তত ৩০টি পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে কক্সবাজার সদরে আত্মীয়ের বাসায় পাড়ি জমিয়েছেন। এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, "পাকা ঘর বলে আমি রয়ে গেছি মালপত্র পাহারা দিতে, কিন্তু স্ত্রী-সন্তানদের পাঠিয়ে দিয়েছি। জানালার পাশে ঘুমানো এখন মরণকে ডাক দেওয়ার সমান।

গত রোববারের ঘটনাটি লম্বাবিলবাসীর হৃদয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৯ বছরের শিশু হুজাইফা আফনান বাবার সাথে দোকান থেকে মটরভাজা কিনে খাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বুলেট এসে বিঁধে যায় তার মাথায়। বর্তমানে সে ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

হুজাইফাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। হাতে মেয়ের পাঠ্যবই নিয়ে বিলাপ করছেন বাবা জসীমউদ্দীন। তিনি বলেন, মেয়ের অপরাধ কী ছিল? সে তো যুদ্ধ বোঝে না। শুধু একটি মটরভাজা খেতে চেয়েছিল। পুরো গ্রাম এখন শিশুটির রোগমুক্তির জন্য দোয়া করছে, কিন্তু ওপার থেকে আসা গুলির শব্দ তাদের প্রার্থনাকেও বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।

সীমান্তের অস্থিরতা কেবল গুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সোমবার লম্বাবিল এলাকায় নিজের মাছের ঘেরে কাজ করতে গিয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক পা হারিয়েছেন মোহাম্মদ হানিফ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হানিফের বাবা ফজলে করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সীমান্তে কেন মাইন থাকবে? আমাদের ফসলি জমি আর ঘের কি এখন মরণফাঁদ?

সীমান্তের প্রায় ২০০টি পরিবার মাছ ও কাঁকড়া চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে টানা গোলাগুলির কারণে কেউ ঘেরে যেতে পারছেন না। ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা রবিউল ইসলাম জানান, ঘেরে যেতে না পারলে তাঁর সব বিনিয়োগ শেষ হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, দিনমজুর রহিম মিয়া প্রতিদিন ৬০০-৮০০ টাকা আয় করতেন ঘেরে কাজ করে। ছয় দিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় তাঁর ঘরে চুলা জ্বলা দায় হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গুলি যদি নাও মারে, না খেয়ে আমাদের মরে যেতে হবে।

রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিমান ও ড্রোন হামলা তীব্রতর হয়েছে। এর ফলে মংডু টাউনশিপের ওপারে রণক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতের সুযোগ নিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা ৫২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান শাহজালাল জানান, ওপারে জান্তা বাহিনীর সাথে আরাকান আর্মি ছাড়াও আরও তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।

সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবিতে গতকাল বিকেলে টেকনাফের শাপলা চত্বরে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা সীমান্তে টহল বাড়ানো এবং জীবন-সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে। লোকজনকে আতঙ্কিত না হতে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। 

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ লড়াই এখন বাংলাদেশের সীমান্তের সার্বভৌমত্ব ও জননিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একদিকে গুলির ক্ষত, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দা—টেকনাফের এই সীমান্ত জনপদ এখন দ্বিমুখী সংকটে। হুজাইফার রক্তমাখা বই আর হানিফের হারিয়ে যাওয়া পা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সীমান্তের ওপার থেকে আসা বারুদের গন্ধ এপারে কেবল ধ্বংস আর আর্তনাদ বয়ে আনছে।

এএন