পরিত্যক্ত পানিতে কোটি টাকার লবণ উৎপাদন

চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম
পরিত্যক্ত পানিতে কোটি টাকার লবণ উৎপাদন

যুগ যুগ ধরে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিই লবণ উৎপাদনের প্রধান উৎস। তবে লবণ মিলের পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে যে লবণ উৎপাদন করা সম্ভব এ তথ্য অনেকেরই অজানা। সেই অজানা সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভ্রাম্যমাণ লবণ চাষীরা।

জানা গেছে, প্রায় এক যুগ ধরে পটিয়ার ইন্দ্রপুল এলাকায় লবণ কারখানার পরিত্যক্ত পানি ও মিষ্টি পানির মিশ্রণে প্রায় ১০০ একর খোলা জমিতে লবণ চাষ করা হচ্ছে। 

পলিথিন ট্রে ব্যবহার করে উৎপাদিত এ লবণ খাবারের কাজে ব্যবহৃত না হলেও দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা, মাছের হ্যাচারি, কৃষিকাজ এবং মাছ ও চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে বছরে উৎপাদন হচ্ছে কোটি টাকার লবণ।

এদিকে, কারখানার পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে বছরে কোটি টাকার লবণ উৎপাদন হলেও এ সম্ভাবনাময় খাতটির ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। পটিয়া বিসিক শিল্প নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত রিপোর্টিং করলেও বাস্তব তদারকি খুব সীমিত। 

চাষিরা জানান, এখন পর্যন্ত এ খাতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। তবে যথাযথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে লবণ উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

বাঁশখালী উপজেলার ভ্রাম্যমাণ লবণ চাষী জসিম উদ্দিন জানান, তিনি প্রায় এক যুগ ধরে লবণ মিলের পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে লবণ চাষ করে আসছেন। এবার তিনি ১৬ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে লবণ চাষ করেছেন। 

তার ভাষ্যমতে, প্রতি একর জমিতে প্রায় একশ মণ লবণ উৎপাদন হয় এবং প্রতি সপ্তাহে জমি থেকে লবণ সংগ্রহ করা হয়। তিনি আরও জানান, লবণ মিলের পরিত্যক্ত পানি প্রথমে একটি পুকুরে জমা করা হয়। পরে খালের মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশিয়ে খোলা জমিতে পলিথিন ট্রে ব্যবহার করে লবণ উৎপাদন করা হয়। এতে একদিকে পরিত্যক্ত পানি কাজে লাগছে, অন্যদিকে জমির মালিকও আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।

পটিয়া সদরের ইন্দ্রপুল এলাকার জে.কে. সল্ট ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজের বিক্রয় ও বিপণন কর্মকর্তা মনসুর আলম জানান, ইন্দ্রপুল এলাকায় প্রায় ১০০ একর জমিতে পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়। মানভেদে এ লবণের বাজারমূল্য বছরে ১০ কোটি টাকার বেশি। 

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক লবণ মিল মালিক অভিযোগ করেন, পরিত্যক্ত পানি দিয়ে উৎপাদিত এ লবণ খাবার উপযোগী না হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তা খাবার লবণের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারজাত করেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, পটিয়া ইন্দ্রপুল এলাকায় এক সময় ৫০–৬০টি লবণ মিল ছিল। তবে বাইপাস সড়ক নির্মাণ ও করোনার প্রভাবে অনেক মিল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০–৪০টি লবণ মিল চালু রয়েছে। এসব মিলে কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফ থেকে কাঁচামাল এনে খাবার উপযোগী লবণ উৎপাদন করা হয়।

পটিয়া লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক আল্লাই বলেন, পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে লবণ উৎপাদনের ফলে খালে সরাসরি বর্জ্য পানি পড়ছে না। এতে পানির লবণাক্ততা বাড়ছে না এবং আশপাশের জমিও চাষাবাদের উপযোগী থাকছে। পরিবেশের দিক থেকেও এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

পটিয়া বিসিক শিল্প নগরীর কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র সাহা বলেন, ইন্দ্রপুল এলাকায় কারখানার পরিত্যক্ত পানি ব্যবহার করে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ উৎপাদন হচ্ছে। এটি এ অঞ্চলের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। 

যদিও এ লবণ খাবারের কাজে ব্যবহৃত হয় না, তবে শিল্পকারখানা ও হ্যাচারিতে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তবে ভ্রাম্যমাণ এসব চাষী এখনো সরকারি প্রশিক্ষণের আওতায় আসেননি।

ইএইচ