চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার একটি ঘিঞ্জি গলি। রাস্তার একপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা। লেন্সের ওপাশে ধরা পড়ছে এক ভয়াবহ দৃশ্য তিনজন ব্যক্তি হাতে লাঠি নিয়ে ঘিরে ধরেছেন এক ব্যক্তিকে। শুরুটা ধাক্কাধাক্কি দিয়ে হলেও মুহূর্তেই তা রূপ নেয় পৈশাচিকতায়। শত শত মানুষের চোখের সামনে, প্রকাশ্য রাস্তায় একজন মানুষকে পিটিয়ে নিস্তেজ করে ফেলা হলো। অথচ আর্তচিৎকার শুনেও কেউ এগিয়ে এলেন না। নগরীর মিদ্যাপাড়ায় ঘটে যাওয়া এই বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন খোরশেদ আলম নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক।
গতকাল বুধবার রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার আমিন জুট মিল এলাকার মিদ্যাপাড়ায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে পুলিশ যে তথ্য পেয়েছে, তা সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির জানিয়েছেন, ঘাতকদের সাথে নিহত খোরশেদ আলমের কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না। এমনকি ছিল না কোনো জমিজমা বা ব্যক্তিগত বিরোধ। স্রেফ ‘মুখের দুর্গন্ধ’ নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে প্রাণ দিতে হলো একজন নিরপরাধ চালককে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, খোরশেদের মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে আসামিরা তাকে কটাক্ষ শুরু করেন। আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় খোরশেদ প্রতিবাদ করলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। যা পরবর্তীতে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গোলাপি রঙের শার্ট পরা খোরশেদ আলমকে তিনজন ব্যক্তি লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। লাঠির আঘাতে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার পর ঘাতকদের হাত থামেনি। বরং নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়। ভিডিওর সবচেয়ে ভীতিজনক দিক ছিল স্থানীয়দের নির্বিকার ভূমিকা। গলির রাস্তায় হত্যাকাণ্ডটি সশরীরে প্রত্যক্ষ করলেও ভয়ের কারণে বা উদাসীনতায় কেউ আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। খোরশেদের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলে ঘাতকরা বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের মাথায় ও মুখমণ্ডলে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা প্রমাণ করে যে ঘাতকরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আঘাত করেছিল।
ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে জড়িতদের মধ্যে মো. হোসেন নামের একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহভাজন আরও একজনকে আটক করা হয়েছে, তবে তদন্তের প্রয়োজনে তার নাম এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ।
ওসি জাহিদুল কবির বলেন, “এটি একটি কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড। জড়িতদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং আমরা দ্রুততম সময়ে আসামিদের আইনের আওতায় আনব।”
উল্লেখ্য যে, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকাটি গত কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত। মাত্র গত সোমবার এই থানার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এক অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং আহত হন আরও তিনজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই একজন অটোরিকশা চালককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে গভীর আতঙ্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম যন্ত্রণাদায়ক অংশ হলো প্রত্যক্ষদর্শীদের নীরবতা। ভিডিওতে দেখা গেছে, মানুষজন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন বা দাঁড়িয়ে দেখছেন, কিন্তু কেউ হাত বাড়িয়ে ঘাতকদের থামানোর চেষ্টা করেননি। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভয় কাজ করছে যে, প্রতিবাদ করতে গেলে তারা নিজেরাই হামলার শিকার হবেন অথবা পুলিশি ঝামেলার মুখে পড়বেন। এই আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাই অপরাধীদের দুঃসাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খোরশেদ আলমের মতো সাধারণ মানুষেরা প্রায়ই রাস্তায় এমন তুচ্ছ কারণে হামলার শিকার হন। সচেতন মহল মনে করছেন, যদি ছোটখাটো অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকর হতো, তবে ‘মুখের দুর্গন্ধ’-এর মতো ঠুনকো অজুহাতে একজন মানুষকে পিটিয়ে মারার সাহস কেউ পেত না। খোরশেদ আলমের পরিবার এখন কেবল বিচার চায়। একজন দিনমজুর, যিনি সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন, তার এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
চট্টগ্রামের এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি আমাদের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি প্রামাণ্য দলিল। যেখানে জীবনের চেয়ে অহংকার বড় হয়ে দাঁড়ায় এবং যেখানে হাজারো মানুষের ভিড়ে একজন মানুষ একা মৃত্যুবরণ করেন, সেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন প্রশাসনের দিকে খোরশেদ হত্যার বিচার কি দ্রুত হবে, নাকি এটিও ধামাচাপা পড়বে হাজারো অমীমাংসিত ফাইলের নিচে?
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন