নির্বাচন মানেই লড়াই, কিন্তু সেই লড়াই যখন ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ায় তখন তা ভিন্ন মাত্রা পায়। লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে বর্তমানে এমনই এক পারিবারিক ও রাজনৈতিক দ্বৈরথ দৃশ্যমান হচ্ছে।
এ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মাহবুব আলম। মজার বিষয় হলো, নিজের ছেলের জয় নিশ্চিত করার পরিবর্তে তার বাবা আজিজুর রহমান জানপ্রাণ দিয়ে খাটছেন বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমের ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের জন্য।
শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী মাহবুব আলম জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই। ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি এলাকায় বেশ জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, তার পিতা আজিজুর রহমান কেবল একজন সাধারণ অভিভাবক নন, তিনি ইছাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইছাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে জোরদার প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন আজিজুর রহমান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অন্তত ১৮টি পথসভায় তিনি সরাসরি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়েছেন। সেখানে তিনি দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত করার পাশাপাশি ছেলের প্রতীকের পরিবর্তে নিজের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীকের গুণগান গেয়েছেন।
ছেলের বিপরীতে ভোট চাওয়ার বিষয়ে আজিজুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সাবলীল। তিনি তার এ অবস্থানকে আদর্শিক লড়াই হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, পরিবার আমার ব্যক্তিগত বিষয়, আর রাজনীতি আমার আদর্শ ও অবস্থানের জায়গা। আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে রাজনৈতিক আদর্শ পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমি আমার দলের প্রার্থীর পক্ষেই মাঠে নেমেছি। তবে বাবা হিসেবে ছেলের জন্য আমার দোয়া সব সময়ই আছে।
বাবার এমন প্রকাশ্য বিরোধিতার বিষয়ে এনসিপি প্রার্থী মাহবুব আলম বেশ সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিষয়টি তার নজরে এসেছে স্বীকার করলেও তিনি এ নিয়ে কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি কেবল এটুকুই বলেছেন, এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। কেন তিনি এমন করছেন তা বাবাকেই জিজ্ঞাসা করা ভালো।
রামগঞ্জের নারায়ণপুর এলাকার মোল্লা বাড়ির এ ঘটনাটি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। অনেক ভোটার বলছেন, এটি সুস্থ রাজনীতির একটি উদাহরণ হতে পারে, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক রাজনৈতিক বিশ্বাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এতে মাহবুব আলমের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাধারণত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবারের প্রধান যে দল করেন, অন্য সদস্যরা তাকেই অনুসরণ করেন। কিন্তু রামগঞ্জের এ চিত্র বলছে, দেশের রাজনৈতিক সচেতনতা এক নতুন মোড় নিচ্ছে। যেখানে একই ছাদের নিচে বসবাস করেও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে শ্রদ্ধা জানানো এবং লালন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ভোটের দিন ইছাপুর ইউনিয়নের এ মোল্লা বাড়ির ভোটটি আসলে কোন বাক্সে পড়বে? বাবার আদর্শের ‘ধানের শীষ’ নাকি ছেলের স্বপ্নের ‘শাপলা কলি’? উত্তরটা হয়তো কেবল ভোটের ফলাফলই দিতে পারবে।
ব্যক্তিগত স্নেহ বনাম রাজনৈতিক আনুগত্যের এ লড়াই রামগঞ্জবাসীকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। আজিজুর রহমান প্রমাণ করলেন যে, আদর্শের কাছে কখনো কখনো রক্তসম্পর্কও গৌণ হয়ে যায়। আর মাহবুব আলম প্রমাণ করছেন, পারিবারিক ভিন্নমত থাকলেও নিজ পথে অবিচল থেকে নির্বাচন করা সম্ভব।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন