ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হঠাৎ করেই নতুন রূপ নিয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম হেভিওয়েট প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর সমর্থনে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন জোটের আরেক শরিক দলের প্রার্থী। এই আসন থেকে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এখন হাসনাতের 'শাপলা কলি' প্রতীকের বিজয়ে মাঠ চষে বেড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন।
গতকাল রোববার বিকেলে দেবীদ্বার পৌর এলাকার ফতেহাবাদ গ্রামে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ যখন তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ করছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত হন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মজিবুর রহমান। তিনি শুধু উপস্থিতই হননি, বরং হাসনাত আবদুল্লাহর পাশে দাঁড়িয়ে ভোটারদের কাছে গিয়ে 'শাপলা কলি' প্রতীকে ভোট চেয়েছেন।
মজিবুর রহমান বর্তমান জোটের শরিক হিসেবে নিজেকে হাসনাতের প্রধান সমর্থক হিসেবে ঘোষণা দেন। এই ঘটনার পর দেবীদ্বারের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জোটের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নির্বাচনী মাঠের শক্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি মোহাম্মদ মজিবুর রহমানকে 'দেয়ালঘড়ি' প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় পার হয়ে যাওয়ায় আইনিভাবে ব্যালট পেপারে তাঁর নাম ও প্রতীক থেকে যাচ্ছে। তবে আজ সোমবার সকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মজিবুর রহমান তাঁর অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার করেন।
তিনি বলেন, শেষ দিনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় আমাকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাসনাত আবদুল্লাহ আমাদের এই জোটের মূল প্রার্থী। জোটের বৃহত্তর স্বার্থে এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে আমি তাঁর পক্ষেই মাঠে নেমেছি। এখন থেকে আমি নিয়মিত তাঁর গণসংযোগে অংশ নেব এবং শাপলা কলি মার্কার জন্য কাজ করব। ব্যালট পেপার থেকে প্রতীক সরানোর সুযোগ না থাকলেও ভোটারদের কাছে আমার আহ্বান থাকবে তাঁরা যেন হাসনাত আবদুল্লাহকেই ভোট দেন।
কুমিল্লা-৪ আসনে রাজনৈতিক লড়াইটা অন্যরকম হতে পারত যদি বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী মাঠে থাকতেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর তিনি উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিলেও গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট তাঁর রিট খারিজ করে দেন। ফলে বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থীর নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়া হাসনাত আবদুল্লাহর জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিএনপির একটি বড় অংশ এখন এনসিপি প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
দেবীদ্বার আসনে এখন মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে হাসনাত আবদুল্লাহ থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আরও কয়েকজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তাঁরা হলেন:
আবদুল করিম: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (প্রতীক: হাতপাখা)
ইরফানুল হক সরকার: ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ (প্রতীক: আপেল)
জসিম উদ্দিন: গণ অধিকার পরিষদ (প্রতীক: ট্রাক)
দেবীদ্বার পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপির কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে তাঁর আলাদা একটি আবেদন রয়েছে। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর সমর্থন আসায় ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ভোটারদের একটি বড় অংশও এখন তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে বিএনপির সাধারণ সমর্থকদের ভোট নিজের বাক্সে আনা এবং অন্যান্য প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান। বিশেষ করে জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় কতটুকু তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়, তার ওপরই নির্ভর করছে হাসনাতের চূড়ান্ত বিজয়।
কুমিল্লা-৪ আসনে মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের এই সমর্থন প্রদান হাসনাত আবদুল্লাহর পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। জোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকার ফলে ভোটের অঙ্কে তিনি অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে দেবীদ্বারের মানুষ কার হাতে তুলে দেবেন তাঁদের প্রতিনিধিত্বের ভার, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা কেবল সময়ের।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন