লক্ষ্মীপুরে ‘সিল-কাণ্ড’: আদালতে প্রেসমালিকের জবানবন্দি ও জামায়াতের ‘শুদ্ধি অভিযান’

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম
লক্ষ্মীপুরে ‘সিল-কাণ্ড’: আদালতে প্রেসমালিকের জবানবন্দি ও জামায়াতের ‘শুদ্ধি অভিযান’

লক্ষ্মীপুরে উদ্ধার হওয়া ৬টি অবৈধ ‘ভোটের সিল’ নিয়ে ঘনীভূত রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রেসমালিক সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানিয়েছেন, এই সিলগুলো তৈরির নেপথ্য কারিগর ছিলেন স্থানীয় জামায়াত নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ। এই জবানবন্দির পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তাল হাওয়া, যার রেশ ধরে অভিযুক্ত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী।

বুধবার বিকেলে লক্ষ্মীপুরের বিচারিক আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ‘মারইয়াম প্রেস’-এর স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা। জবানবন্দিতে তিনি স্পষ্ট করেন যে, পেশাগত কাজের অংশ হিসেবেই তিনি সিলগুলো তৈরি করেছিলেন, তবে এর নির্দেশদাতা ছিলেন লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি সৌরভ হোসেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জানুয়ারি সৌরভ হোসেন তার হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সিল তৈরির কার্যাদেশ (অর্ডার) পাঠান। সোহেল রানা আদালতকে জানান, সিলের আইনি বৈধতা যাচাই না করেই তিনি অর্ডারের ভিত্তিতে সেগুলো তৈরি করেছিলেন।

সিল উদ্ধারের ঘটনার পর শুরুতে জামায়াতে ইসলামী একে ‘বিএনপির মিথ্যাচার’ বলে দাবি করলেও, আদালতে সৌরভের নাম আসার পর অবস্থান পরিবর্তন করেছে দলটি। দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত নেতা সৌরভ হোসেনকে বহিষ্কার করেছে জেলা জামায়াত।

জেলা জামায়াতের আমির এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সৌরভ দাবি করেছেন তিনি ভোটারদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি শেখানোর জন্য সিলগুলো বানিয়েছিলেন। কিন্তু এটি একটি দায়িত্বহীন কাজ। এই ঘটনার দায়ে আমরা তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। তবে যার দোকান থেকে সিল উদ্ধার হয়েছে (সোহেল রানা), তিনি আমাদের দলের কেউ নন।

এই সিল-কাণ্ড লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি একে বিশাল এক ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর নীল নকশা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, কেবল সিল নয়, এর পেছনে ব্যালট ছাপানোর মতো বড় কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী রেজাউল করিম একে ‘দায়িত্বহীন কাজ’ হিসেবে স্বীকার করলেও পুরো দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার। দলটির দাবি, একজন ব্যক্তির ভুল বা অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা সংগঠনকে দায়ী করা অযৌক্তিক।

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহেদ পারভেজ জানান, সোহেল রানার জবানবন্দির পর মামলার তদন্ত এখন ভিন্ন মোড় নিয়েছে। পুলিশ মূলত দুটি প্রধান প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে:

ভোটের প্রশিক্ষণ: জামায়াতের দাবি অনুযায়ী কি সত্যিই সাধারণ ভোটারদের হাতে-কলমে ভোট দেওয়া শেখাতে এই সিলগুলো তৈরি করা হয়েছিল?

ভোট জালিয়াতি: নাকি ভোটের দিন কেন্দ্রের গোপন কক্ষে অবৈধভাবে ব্যালট পেপারে ছাপ দেওয়ার জন্য এই অগ্রিম প্রস্তুতি ছিল?

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দ করা মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেখান থেকে আরও বড় কোনো সিন্ডিকেটের হদিস পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রশাসন।

আদালতে নাম আসার পর থেকেই ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের বহিষ্কৃত সেক্রেটারি সৌরভ হোসেন আত্মগোপনে রয়েছেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। এদিকে, লক্ষ্মীপুর শহরে এই ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা কৌতূহল ও শঙ্কা কাজ করছে। মিত্র দলগুলোর মধ্যে এমন ‘অবিশ্বাস’ ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

একটি সামান্য সিল তৈরি করা যে কত বড় আইনি ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, লক্ষ্মীপুরের এই ঘটনা তার জলজ্যন্ত উদাহরণ। এটি কেবল একজন প্রেসমালিককে জেলেই পাঠায়নি, বরং একটি বড় রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং নির্বাচনী জোটের ফাটলকেও স্পষ্ট করেছে।

প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যে এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা—ভোটের মাঠে ‘অতি-উৎসাহ’ অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে।

এএন