ভোরের আলো ফোটার আগেই বিকট শব্দে কেঁপে উঠল সীমান্তঘেঁষা জনপদ। যখন সারা দেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ আর নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘটল এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ককটেল তৈরির সময় অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন অজ্ঞাতনামা দুইজন এবং গুরুতর দগ্ধ ও আহত হয়েছেন আরও তিনজন।
শনিবার ভোর ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি বসতবাড়িতে গোপনে ককটেল তৈরির সময় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, ফজর নামাজের আগে হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে গোটা গ্রাম থরথর করে কেঁপে ওঠে। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে গ্রামের মানুষ দেখতে পান মো. কালাম নামে এক ব্যক্তির বসতবাড়ি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায় বীভৎস দৃশ্য, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কয়েকজনের দেহ।
পুলিশ জানায়, কালামের বাড়িতে ভোরে কয়েকজন ব্যক্তি জড়ো হয়ে ককটেল বা হাতবোমা তৈরি করছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তৈরির কোনো এক পর্যায়ে অসাবধানতাবশত একটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে এবং চেইন রিঅ্যাকশনে সেখানে থাকা অন্যান্য বিস্ফোরকগুলোও ফেটে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, ঘটনাস্থলেই দুইজনের মৃত্যু হয়। তাদের দেহগুলো এতটাই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও তিনজন। তারা হলেন বজলুর রহমান, মো. মিনহাজ এবং মো. শুভ। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের শরীরের একাংশ পুড়ে গেছে এবং স্প্লিন্টারের আঘাতে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এলাকাটি বর্তমানে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের ক্রাইম সিন ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, এই ব্যক্তিবর্গ ককটেল তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নিহতদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো বড় নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাড়ির মালিক মো. কালাম পলাতক রয়েছেন, তাকে আটকের চেষ্টা চলছে।
নির্বাচন পরবর্তী এই সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন বিস্ফোরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও কেন এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরি করা হচ্ছিল। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় বা কোনো নাশকতার উদ্দেশে এই বোমাগুলো মজুত করা হচ্ছিল কি না, তা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকাটি অনেক সময় অবৈধ বিস্ফোরক চোরাচালানের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এলাকায় কোনো অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন যুবককে। সুস্থ হওয়ার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই চক্রের মূল হোতা এবং বিস্ফোরক তৈরির নেপথ্য কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন