গোপালগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে ১০ মাসের শিশু কন্যা তুবা ইসলাম তোহার মৃত্যু এলাকাবাসীর মধ্যে ভীতি ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, আবার কি মরণব্যধি হাম ফিরে আসছে। বিষয়টি নিয়ে গোপালগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। তারা তোহার চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট ও উপসর্গ নিয়ে কেস স্টাডি তৈরি করছেন।
জেলার মুকসুদপুর উপজেলার টেংরাখোলা ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গা গ্রামের তুহিন শেখের তৃতীয় সন্তান ১০ মাসের ফুটফুটে তুবা ইসলাম তোহা।
তোহার মা নাজমা বেগম বলেন, হঠাৎ গত ১৯ মার্চ তার তুবার জ্বর দেখা দেয়। এর পরের দিন ২০ মার্চ জ্বরের সঙ্গে হালকা শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাকে মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তখন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সুমন সাহা তাকে চিকিৎসা দেন। কিন্তু কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় দিনমজুর পিতা তুহিন শেখ ২৪ মার্চ স্থানীয় সেবা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. কামাল হোসেনের কাছে নিয়ে যান। তিনি বিভিন্ন প্রকার ওষুধ লেখেন এবং ব্যবস্থাপত্র দেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল আসেনি। বরং শিশুটির জ্বর, শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে সারা শরীরের হাম দেখা দেয়।
গত ২৬ মার্চ সকাল ৯ টার দিকে প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায় আবার মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে ডাঃ মিজানুর রহমান শিশুটির অবস্থা খারাপ দেখে তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেন এবং কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন। পরে ওই রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
শিশুটির মা নাজমা বেগম বলেন, আমরা সরকারি হাসপাতালের সেবায় অসন্তুষ্ট হওয়ায় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ঢাকার মালিবাগে বিএনকে লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মেয়েকে। ওইখানের চিকিৎসক আমার বাচ্চাকে আইসিইউ সাপোর্ট দেন এবং চিকিৎসা করেন। তখন কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু গত ২৭ মার্চ দুপুর ১২টায় আমার কোলের মধ্যে আমার আদরের ধন নিস্তেজ হয়ে হাত-পা ছাড়ে। তখন আমি চিৎকার দিলে চিকিৎসকরা নানা চেষ্টা করেন, কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে যায়।
ওই শিশুর পিতা তুহিন শেখ বলেন, আমি আমার শিশু সন্তানকে নিয়ে মুকসুদপুর হাসপাতাল, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও ঢাকায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়েছি। কিন্তু কোনো চিকিৎসায়ই কাজ হলো না। আমার সোনার টুকরা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। গত শুক্রবার স্থানীয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে আমার তোহার দাফন হয়। আজ (২৯ মার্চ) বাদ আসর ওর জন্য মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করেছি। আল্লাহ যেন ওকে জান্নাতবাসী করেন।
টেংরাখোলা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী খোরশেদা মল্লিক ডলি বলেন, জন্মের পর থেকে শিশুটিকে রুটিন মাফিক টিকা দেওয়া হয়েছে। গত ২৫ মার্চ শিশুটিকে হামের টিকা দেওয়ার জন্য আমি তুহিন শেখের বাড়িতে এসেছিলাম। তখন তুহিন শেখের স্ত্রী নাজমা বেগম জানান, তার বাচ্চাটি অসুস্থ। তাই আমি হামের টিকা না দিয়ে বলি, ২৫ এপ্রিল তিনি আবার টিকা দিতে আসবেন। পরে জানতে পারি শিশুটি মারা গেছে।
মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের টিএইচএন্ডএফপিও ডাঃ রায়হান ইসলাম শোভন বলেন, স্বজনরা শিশুকে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২০ ও ২৬ মার্চ চিকিৎসা নিতে আনেন। ২৬ মার্চ শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়। শুনেছি সেখান থেকে ঢাকা পাঠানো হয় এবং ২৭ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ডিজি অফিস থেকে শিশুর মৃত্যুর তথ্য চাওয়া হয়েছে। আমরা যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে পাঠিয়েছি। ডিজি অফিস পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আমাদের অবহিত করলে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে গত ৩ বছরে আমরা এখানে হামের কোনো পজিটিভ রুগী পাইনি। হাম ছোঁয়াচে রোগ হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আমি মনে করি, শিশুটির মৃত্যুর কারণ আমাদের জন্য জানা খুবই প্রয়োজন। তা না হলে মানুষের মুখে মুখে হামে মৃত্যু ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন