পাবনার৬ ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে আজ রণক্ষেত্রের রূপ নেয় ছাত্র রাজনীতি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং চট্টগ্রাম সিটি কলেজের একটি ঘটনার জের ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এই সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিটি কলেজের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনার প্রতিবাদ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির সেই উত্তাপ আজ বৃহস্পতিবার সকালে এসে পৌঁছে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে।
সকাল থেকেই দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ ব্যানার ও স্লোগান নিয়ে ক্যাম্পাসে এবং এর আশপাশের এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সকাল ৯টার পর থেকেই ক্যাম্পাসের আবহাওয়া থমথমে হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষই শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করলে উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছায়।
সকাল ১০টার দিকে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাসে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রূপ নেয়। সংঘর্ষ চলাকালীন পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দিগিবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকেন।
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে হঠাৎ বিকট শব্দে অন্তত দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ককটেলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে কলেজ চত্বর। বিস্ফোরণের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় ইটপাটকেল ও লাঠিসোটার আঘাতে দুই সংগঠনের অন্তত ৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ক্যাম্পাস এলাকায় ধাওয়ার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে ঈশ্বরদী রেলগেট এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান। বিক্ষোভের কারণে কিছুক্ষণ রেলগেট এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের কোনো সহিংসতা এড়াতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নিয়েছেন।
এ বিষয়ে ‘ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান‘ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘সকালে কলেজ এলাকায় দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা খবর পাওয়ামাত্রই সেখানে ফোর্স পাঠিয়েছি। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে টহল জোরদার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সংঘর্ষে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে, তখন এই ধরনের সংঘাত পড়াশোনার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তারা ক্যাম্পাসকে সব ধরনের সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চট্টগ্রামের একটি ঘটনার রেশ ধরে শত মাইল দূরে পাবনার একটি উপজেলায় কেন এই ধরনের সংঘাত ঘটল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র রাজনীতির সুস্থ ধারা বজায় না থাকলে এ ধরনের সংঘাত বাড়তেই থাকবে, যা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশকে বিনষ্ট করে।
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে আজকের এই ঘটনা রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাবকেই প্রকট করে তুলেছে। ককটেল বিস্ফোরণ ও রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের পর বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশি তৎপরতা থাকলেও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট দলগুলোর স্থানীয় নেতৃত্ব এবং প্রশাসন শান্তি বজায় রাখতে কী ধরনের ভূমিকা পালন করে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন