মালয়েশিয়াপ্রবাসী ছেলের ফেরার আনন্দে বুক বেঁধেছিলেন মা। দীর্ঘ ১১ বছর পর ছেলে ফিরছে ঘরে, আগামীকালই যাওয়ার কথা ছিল পাত্রী দেখতে। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিলো বিষাদে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চালকসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার ভোরে মালিগ্রাম এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই চারজনের মৃত্যুতে তাঁদের গ্রামজুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে।
ঢাকা-ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রামে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া প্রাইভেটকারটি যেন এক বুক স্বপ্নের সমাধি। আজ ভোরে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে সজোরে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় কারটি। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান চালক এবং যশোর ঝিকরগাছার বালিয়াডাঙ্গা গ্ৰামের এক পরিবারের মাসহ ৪ জন। আহত হয় আরও দুই শিশু। মালয়েশিয়াফেরত ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে এই দুর্ঘটনা।
নিহতরা হলেন- মালয়েশিয়াপ্রবাসী আরিফ ইসলাম, তাঁর মা নুরজাহান বেগম, ভাই রাকিব, বোন আয়শা বেগম এবং গাড়িচালক জাহিদ। এ ঘটনায় আশরাফুল ও তাছফিয়া নামের দুটি শিশু গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে।
নিহত আরিফের মামা নজরুল ইসলাম আমার সংবাদকে জানান, আরিফ ১১ বছর বিদেশ ছিলেন। সোমবার দিবাগত রাতে বিমানবন্দরে নেমেছিলেন। সন্তানকে আনতে গিয়েছিলেন মা নূরজাহান বেগম ও তাঁর ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা। ফেরার পথে একই পরিবারের চারজন মারা গেলেন। বাবা ছাড়া পরিবারে এখন আর কেউ রইল না।
ভূমিহীন পরিবারের সন্তান আরিফ ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। মালয়েশিয়ায় ঘাম ঝরানো উপার্জনে ৫ শতক জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। দীর্ঘ এক দশক পর গতকাল সোমবার রাতে ছুটিতে দেশে ফেরেন আরিফ। বাড়ি ফিরেই আগামীকাল বুধবার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ারও কথা ছিল। একবুক আশা ও আনন্দ নিয়ে প্রিয় সন্তান আর ভাইকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলেন মা নুরজাহানসহ পুরো পরিবার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাড়ি ফেরা আর হলো না।
প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর আলম ও মামাতো ভাই মিন্টু রহমান জানান, খুবই অভাবের সংসার ছিল তাঁদের। আরিফ ১৮ বছর বয়সে বিদেশ গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে সংসারে সুখ ফিরিয়েছিলেন। বাড়ি করার জন্য জমিও কিনেছিলেন। কিন্তু যখন সুখ ভোগ করার সময় এলো, তখনই এক দুর্ঘটনায় পরিবারের সবাই চলে গেলেন।
পরিবারের ৫ সদস্যের মধ্যে শুধু বাড়িতে থাকার কারণে বেঁচে গেছেন হতভাগা পিতা শহিদুল ইসলাম। তিনি এখন সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ ও একা হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোসলেম উদ্দিন জানান, পরিবারটি ভূমিহীন ছিল। বাড়ি ছাড়া তাঁদের কোনো জমি নেই। ফলে পারিবারিক কবরস্থানেই এই চারজনকে দাফন করা হবে।
শিবচর হাইওয়ে থানার এসআই নুর আলম জানান, মালিগ্ৰাম বাসস্ট্যান্ডে গ্যাস ভর্তি দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে যশোরগামী প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকে যায়। নিহতদের লাশ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন