দিনাজপুর জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে খরচ বাড়ায় বাজারে চালের দাম বেড়েছে। চলতি মাসে বস্তা প্রতি চালের দাম বেড়েছে ১৫০-৩০০ টাকা। দিনাজপুরের চাল উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে চাল উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। বাজারে চালের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে চালের ব্যবসায়ীরা জানান।
চলতি মাসে ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত চালের বাজারে স্বস্তির বার্তা থাকলেও নতুন ধান কৃষকেরা কাটার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ে। আবার চালের দাম কিছুটা কমলেও এখন এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে গেছে। অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী জেলা হচ্ছে দিনাজপুর। এবার ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজারে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এই ভরা মৌসুমে লাগামহীন হয়ে উঠেছে চালের বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ১৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বিভিন্ন জাতের ধানের চাল বাজারে উঠলেও দাম কমেনি। বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ ভোক্তারা চাপে পড়েছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভরা মৌসুমে চালের দাম না কমার পিছনে নানান কারণ রয়েছে। চালের মূল্যবৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ধানের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
দিনাজপুরের সবচেয়ে বৃহৎ চালের মোকাম বাহাদুর বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার ১০০ টাকা থেকে বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। আঠাশ চাল বস্তাপ্রতি ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৮৫০ টাকা, উনত্রিশ জাতের চাল ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা, স্বর্ণা চাল ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং চিনিগুঁড়া চালের বস্তা ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের শেষের দিকে বাজারে ধান সরবরাহ কমে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাজারে যে পরিমাণ ধান রয়েছে তার বড় অংশ মজুদকারীদের নিয়ন্ত্রণে। তারা নিজস্ব গুদামে ধান মজুদ করছে। ফলে ধানের দাম বাজারে হু হু করে বাড়ছে। কারণ অটো রাইস মিলগুলো ধান ক্রয় করে মজুদ করে মিল চালু রাখতে হচ্ছে। ধানের মজুদ না করলে মিলগুলো চালাতে পারবে না, এতে তাদের ক্ষতি গুণতে হবে।
দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় ছোট-বড় মিলে প্রায় ২ হাজার চালকল রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি অটো রাইস মিল। প্রতিদিন ৬-৭ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হতো, বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে ৩-৪ হাজার মেট্রিক টনে, প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে- মিল মালিকদের এমন ভাষ্য।
উৎপাদনের একটি বড় অংশই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নির্ভর। একটি অটো রাইস মিলে প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ খাতে। তারা গত বছর ধান মজুদ করে রেখে মিল চালিয়ে বাজারে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক মিল সরকারের সাথে চাল সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। সেখানেও তাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে, যেহেতু তারা বেশি দামে ধান ক্রয় করে রেখেছিল। বর্তমান বাজারে হঠাৎ করে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এসব কারণে।
ফুলবাড়ী উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অটো মিলের মালিক শ্রী রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেন, ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত চাল বিক্রয়ে লাভ করছে তা এমন নয়। আমরা বিভিন্ন কারণে ও সমস্যার মধ্যে অল্প লাভে মিলগেট থেকে চাল বাজারে সরবরাহ করছি ব্যবসায়ীদের কাছে। চাল ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে ক্রয় করে গুদামে রেখে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে।
একইভাবে ফুলবাড়ী পৌরসভার খোলা বাজারের চাল ব্যবসায়ী শ্রী জয়প্রকাশ বলেন, কয়েক হাত বদল হয়ে চাল কিনে খোলা বাজারে আমরা চাল বিক্রি করি, সেখানে ১০-২০ টাকা দাম তো বাড়বেই। এইদিকে বাজারের ধানের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভরা মৌসুম শেষ হওয়ার মধ্যে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন