একটি সন্তান জন্ম নেওয়ার খবরই সাধারণত কোনো পরিবারে আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সেখানে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের আগমনে আনন্দের মাত্রা যেমন বহুগুণ বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে উদ্বেগ, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের চিন্তাও। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর তরুণ দম্পতি মোস্তাকিম হোসেন ও সামরিনা আক্তারের জীবন এখন এমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় থাকা এই দম্পতি কখনো কল্পনাও করেননি যে একদিন তাঁদের পরিবারে একসঙ্গে পাঁচটি শিশুর আগমন ঘটবে। চিকিৎসা পরীক্ষায় প্রথম দিকে জানা যায়, সামরিনার গর্ভে একাধিক সন্তান রয়েছে। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, পাঁচটি ভ্রূণ সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে।
চিকিৎসকদের মতে, এমন ধরনের গর্ভধারণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মা ও সন্তান—উভয়ের জন্যই এতে জটিলতার আশঙ্কা থাকে। অনেকেই পরিবারটিকে গর্ভপাতের পরামর্শ দিয়েছিলেন। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল। কিন্তু মোস্তাকিম ও সামরিনা সিদ্ধান্ত নেন, যত কষ্টই হোক, সন্তানদের পৃথিবীতে আনার চেষ্টা করবেন। সেই সিদ্ধান্তের পর শুরু হয় দীর্ঘ সংগ্রাম।
ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ, কঠিন সময় পার
গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় থেকেই সামরিনার শারীরিক অবস্থা জটিল হতে থাকে। একসঙ্গে পাঁচ সন্তান বহন করার কারণে তাঁর শরীরে দ্রুত পরিবর্তন আসে। স্বাভাবিক চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ সময় বিশ্রামে থাকতে হতো।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক মাসে সামরিনা প্রায় পুরোপুরি অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। নিয়মিত পরীক্ষা, বিশেষায়িত স্ক্যান এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে পরিবারটিকে।
স্থানীয় চিকিৎসকেরা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁদের ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে রাজধানীতে এসে ভাড়া বাসায় থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যান তাঁরা।
সময়ের আগেই পাঁচ শিশুর জন্ম
গত ১১ জুন ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সামরিনা পাঁচ সন্তানের জন্ম দেন। নবজাতকদের মধ্যে তিনজন ছেলে এবং দুজন মেয়ে।
তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তানদের জন্ম হওয়ায় প্রত্যেকের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। চিকিৎসকদের ভাষায়, তারা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে জন্মের পরপরই নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে পাঁচ নবজাতকের সবাই বিশেষায়িত পরিচর্যায় রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন সরকারি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এবং অন্যরা একটি বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখতে আরও কয়েক সপ্তাহ নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।
আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুশ্চিন্তা
মা হওয়ার আনন্দ থাকলেও সামরিনার চোখেমুখে এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় উদ্বেগ। তাঁর একটাই চিন্তা- পাঁচ শিশুর সুস্থতা।
তিনি বলেন, সন্তানদের কোলে নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তবে চিকিৎসকেরা যে সময়ের কথা বলছেন, তাতে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। সন্তানদের সুস্থ হয়ে ওঠাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া।
অন্যদিকে নবজাতকদের চিকিৎসা ব্যয়ও পরিবারটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি হাসপাতালে থাকা শিশুদের জন্য প্রতিদিন বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
ঋণ, বিক্রি আর সহায়তায় চলছে চিকিৎসা
মোস্তাকিম পেশাদার পর্যায়ে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁর স্থায়ী কোনো চাকরি নেই। সংসারের সীমিত আয় দিয়ে এত বড় চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসার খরচ মেটাতে তিনি নিজের একটি ব্যবসা বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছে।
সন্তানদের জন্মের আগ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত চিকিৎসা খাতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান তিনি। এখনো সামনে দীর্ঘ চিকিৎসা পথ বাকি।
তবু মোস্তাকিমের কণ্ঠে হতাশার চেয়ে আশাবাদই বেশি। তিনি মনে করেন, অর্থের সংকট কোনো না কোনোভাবে সামলানো যাবে, কিন্তু সন্তানদের সুস্থতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের নজরে বিরল ঘটনা
চিকিৎসকদের মতে, একসঙ্গে একাধিক সন্তানের জন্ম এখন আগের তুলনায় বেশি দেখা গেলেও পাঁচ সন্তানের জন্ম এখনও বিরল ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ক্ষেত্রে নবজাতকদের ওজন কম হওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই জন্মের পরপরই নিবিড় পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশুদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তাদের সুস্থ করে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সহায়তার হাত বাড়িয়েছে সমাজসেবা বিভাগ
পাঁচ শিশুর জন্মের খবর প্রকাশের পর সরকারি কয়েকটি সংস্থা পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর নবজাতকদের চিকিৎসা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সহায়তায় সহযোগিতা করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুগুলোর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
নতুন স্বপ্নের শুরু
সব উদ্বেগ, কষ্ট ও আর্থিক সংকটের মাঝেও এই পরিবারে এখন নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়েছে। পাঁচ নবজাতককে ঘিরে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছেন মোস্তাকিম ও সামরিনা।
তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সন্তানরা সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরুক। এরপর শুরু হবে নতুন এক জীবন, যেখানে একসঙ্গে পাঁচ শিশুর হাসি-কান্নায় মুখর থাকবে তাঁদের ছোট্ট সংসার।
বর্তমানে হাসপাতালের করিডর, চিকিৎসকদের পরামর্শ আর এনআইসিইউর কাচঘেরা কক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাঁদের পৃথিবী। তবু আশা ছাড়ছেন না তাঁরা। কারণ বহু প্রতীক্ষার পর পাওয়া এই পাঁচ সন্তানই এখন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন