খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রণয়ন এবং পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সাহসী উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত শনিবার পুলিশ সদরদপ্তরের এক আদেশে তাঁকে প্রত্যাহার করে সদরদপ্তরে সংযুক্ত করায় স্থানীয় পর্যায়ে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা, ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের মতে, অপরাধ দমনে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে এবং তথ্যদাতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের সপক্ষে কথা বলতে গিয়েই তিনি এই প্রশাসনিক রদবদলের মুখোমুখি হলেন।
জানা যায়, গত ১৭ জুন খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানা এলাকায় আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কেএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সভায় উপস্থিত স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও চরম আতঙ্কের কারণে অনেকেই থানায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বা তথ্য দিতে সাহস পান না। উপরন্তু, পুলিশের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে তথ্যদাতার পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন তাঁরা। জনগণের এমন গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অপরাধ দমন কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে এবং তথ্যদাতাদের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখার শতভাগ আশ্বাস দেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার রাশিদুল ইসলাম।
এ সময় তিনি দৃঢ় ও আবেগপ্রবণ ভঙ্গিতে বলেন, "কোনো ব্যক্তি কোনো ইন্সপেক্টরের কাছে তথ্য দেওয়ার পর তা যদি ফাঁস হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনারা গোপন তথ্য দেবেন, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানলে আমি কথা দিচ্ছি, আমি নিজেই ওই ইন্সপেক্টরকে এই গাছের সঙ্গে ঝুলাইয়া দেব, আপনারা পিটাইয়া মারবেন।"
বক্তব্যের এই অংশটির একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে তীব্র বিতৃতির সৃষ্টি হয়। এর জের ধরেই শনিবার পুলিশ সদরদপ্তরের পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১ শাখার আদেশে তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে ২১ জুনের (আজ) মধ্যে পুলিশ সদরদপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বক্তব্যের কয়েকদিনের মধ্যেই এমন আকস্মিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসায় বিষয়টি নিয়ে খুলনা অঞ্চলের মানুষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেকের মতে, বক্তব্যের ভাষাটি প্রতীকী বা অতিরঞ্জিত মনে হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার নিরিখে তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সৎ এবং জনগণের পক্ষে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ সাঈদ নামে একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, "এই অফিসারকে পুরস্কৃত করার বদলে প্রত্যাহার করা হয়েছে দেখলাম। থানা পর্যায়ের কোনো অসাধু কর্মকর্তা তথ্যদাতার পরিচয় অপরাধীদের কাছে ফাঁস করে দিলে সেই সাধারণ নাগরিক বা তাঁর পরিবার এলাকায় কতটা জীবনঝুঁকির মধ্যে পড়েন, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। উনি জনগণের জানমালের নিরাপত্তার খাতিরেই নিজের বাহিনীর কালো ভেড়াদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।"
একই সুর শোনা গেছে খুলনার মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষের কণ্ঠেও। হুমায়ন নামের এক শিক্ষার্থী এই বিষয়ে বলেন, দীর্ঘদিন পর খুলনার সাধারণ মানুষ একজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছিল। তিনি মাঠপর্যায়ে এসে সরাসরি সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন। একজন কর্মকর্তা যদি বুক ফুলিয়ে বলতে না পারেন যে আপনার তথ্যের নিরাপত্তা আমি দেব, তাহলে সাধারণ মানুষ কখনোই অপরাধীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না। ওনার ভাষা প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ওনার দেশপ্রেম ও সাহসিকতাকে আমাদের স্যালুট জানানো উচিত।
লবণচরা এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি, মাদক বা সন্ত্রাসের তথ্য থানায় দিলে উল্টো তথ্যদাতাই বিপদে পড়েন। রাশিদুল স্যার সেই ভীতিটা দূর করতে চেয়েছিলেন। একজন সৎ ও কর্মঠ অফিসারকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের মনোবল চাঙ্গা হবে এবং সাধারণ মানুষ আবারও তথ্য দিতে ভয় পাবে। আমরা এই আদেশের পুনর্বিবেচনা চাই।
একইভাবে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকার গৃহিণী রাবেয়া বেগম মন্তব্য করেন, "পুলিশের বড় কর্তারা এসি রুমে বসে বড় বড় কথা বলেন, আর রাশিদুল স্যার রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় যেতেন। তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন বলেই হয়তো আজ তাকে বদলি হতে হলো। আমরা খুলনাবাসী ওনার এই সৎ সাহসের পক্ষে আছি।"
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি পেশাদার বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে জনসম্মুখে বক্তব্যের ভাষা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক বা শৃঙ্খলার প্রশ্ন আসতেই পারে, তবে অপরাধ দমনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ের ভীতি দূর করার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলামের অবস্থানকে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
খুলনার সাধারণ মানুষ মনে করছেন, অসাধু পুলিশ সদস্যদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এমন কঠোর বার্তা মূলত পুলিশের ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে উজ্জ্বল করছিল। আর তাই, এই সৎ ও সাহসী কর্মকর্তার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন খুলনার আপামর জনসাধারণ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন