নরসিংদীর বহুল আলোচিত কিশোরী সুমনা আক্তার তিথি (১৩) হত্যা মামলার দুই প্রধান আসামিকে ধরতে ফরিদপুরে পাত্রপক্ষ সেজে এক অভিনব অভিযান চালিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে পরিচালিত ওই অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় দুই সহোদর রমজান আলী ওরফে লিমন ও হাসিবুর রহমান ওরফে শান্তকে। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে জানা যায়, প্রবাসী স্বজনের পাঠানো বিপুল পরিমাণ টাকার লোভেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতি সংঘটিত হয়েছিল।
মঙ্গলবার রাতে পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই এই মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। মামলাটির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে এবং বর্তমানে আদালতে এর বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মামলার নথি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে নরসিংদী সদর উপজেলার শেখেরচর গ্রামে নিজ বাড়িতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় কিশোরী তিথিকে। হামলায় গুরুতর আহত হন তাঁর মা আসমা আক্তার। এ সময় বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার চার দিন পর, ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে দুই ভাই রমজান ও হাসিবুরকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। সে সময় তাঁদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ১০ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কাউছার মিয়া ও ইমন আলী নামের আরও দুই সহযোগীকে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই নরসিংদীর পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম জানান, এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে আদালতে মামলার শুনানি চলছে।
তদন্তকারীরা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় তদন্তে বেশ জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরে নিহত তিথির বাবা মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁর কম্বোডিয়াপ্রবাসী জামাতার পাঠানো টাকা তোলার কাজে সহায়তা করতেন পরিচিত যুবক হাসিবুর রহমান শান্ত। এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে হাসিবুরের মুঠোফোনের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শুরু করে পিবিআই। দেখা যায়, হত্যার রাতে তিনি নরসিংদীতে ছিলেন এবং পরদিন ভোরে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে যান। একই সময়ে তাঁর ভাই রমজান আলী বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে যাচ্ছেন বলে তথ্য পায় পুলিশ।
এরপর আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করতে বোয়ালমারীর একটি বাড়িতে পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা পাত্র সেজে বিয়ের আলোচনার কথা বলে যান। সেখানে কথোপকথনের একপর্যায়ে জানা যায়, আসামিরা অপর এক আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন। এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো বিপুল টাকা বাড়িতে রাখা আছে- হাসিবুরের মাধ্যমে এই তথ্য জানতে পেরে ডাকাতির পরিকল্পনা করেন রমজান। পরিকল্পনা সফল করতে তিনি সঙ্গে নেন কাউছার ও ইমনকে। স্থানীয় বাজার থেকে একটি হাতুড়ি ও রশি কেনা হয়। ২৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোফাজ্জল হোসেন বাড়িতে না থাকার সুযোগে তাঁরা ওই ঘরে যান। তিথি দরজা খোলামাত্রই তাঁর মুখ চেপে ধরা হয় এবং সে চিৎকার করলে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। মেয়ের চিৎকারে মা এগিয়ে এলে তাঁর ওপরও হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই তিথির মৃত্যু হলে একটি লাল বালতিতে কাপড়ে মোড়ানো টাকা পেয়ে তা স্কুলব্যাগে ভরে পালিয়ে যায় খুনিরা।
পিবিআই প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, প্রবাসী স্বজনের পাঠানো টাকার লোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং মাঠপর্যায়ের নিখুঁত অভিযানের সমন্বয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন