বদলে যেতে পারে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতীরের চিত্র, ৭০০ মিটারে বিপুল সম্ভাবনা

বরিশাল ব্যুরো প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম
বদলে যেতে পারে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতীরের চিত্র, ৭০০ মিটারে বিপুল সম্ভাবনা

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম নান্দনিক শহর বরিশাল। কীর্তনখোলা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে সবসময়ই বিশেষ আকর্ষণ। অথচ নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীতীরের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, চরম অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে নিজস্ব সৌন্দর্য হারাচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত মাত্র ৭০০ মিটার নদীতীর পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে বরিশালের পর্যটন শিল্পে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত অংশটি নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রতিদিন হাজারো মানুষ লঞ্চঘাট, নৌবন্দর ও চরকাউয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য এই পথটি ব্যবহার করেন। 

একদিকে কীর্তনখোলার শান্ত জলরাশি, বিশাল বৃক্ষ ও নোঙর করা নৌযান যেমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে; অন্যদিকে ভাঙাচোরা বাঁধ, অস্থায়ী বস্তি, হাঁস-মুরগি ও ছাগলের খামার পুরো এলাকার সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে নদীভাঙন প্রতিরোধে এখানে একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে মানুষের চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি পায়ে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে)। তবে দীর্ঘ প্রায় চার দশকেও প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় বাঁধের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সুযোগে বাঁধের ওপর গড়ে উঠেছে অবৈধ দখল ও বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনা। এ ছাড়া নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও খাদ্য বিভাগের জেটিও এই এলাকায় স্থাপিত হওয়ায় পরিকল্পিত নদীতীর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বরিশালে আগত পর্যটক কিংবা দর্শনার্থীরা শহরে প্রবেশের পরই প্রথমে এই নদীতীরের মুখোমুখি হন। কিন্তু শহরের সৌন্দর্যের প্রতীক হওয়ার পরিবর্তে এলাকাটি এখন শুধুই অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরছে। নদীর পাড়ে বসে প্রকৃতি উপভোগ, হাঁটাহাঁটি কিংবা পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর মতো কোনো পরিকল্পিত অবকাঠামো এখানে নেই।

এই বিষয়ে বরিশাল নৌবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, নদীতীরবর্তী এলাকা নৌবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকলেও প্রতিরক্ষা বাঁধের মূল দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আর এর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করবে বরিশাল সিটি করপোরেশন।

যোগাযোগ করা হলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন জানান, কীর্তনখোলা নদীর তীরজুড়ে প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতীর সংরক্ষণ এবং বাঁধ উন্নয়নের কাজ শেষ করলেই সিটি করপোরেশন তাদের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু করবে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাই এই বিষয়ে বর্তমানে তাদের মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, যখন পুরো ১১ কিলোমিটার নদীতীর উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, তখন শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মাত্র ৭০০ মিটার অংশ কেন বছরের পর বছর এভাবে অবহেলিত ও জরাজীর্ণ থাকবে?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই অংশটিকে দ্রুত অবৈধ দখলমুক্ত করে যদি আধুনিক ওয়াকওয়ে, বসার স্থান, সবুজায়ন, দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা, নদী দর্শনের ডেক, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, সাইকেল ট্র্যাক এবং উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা যায়, তবে কীর্তনখোলা নদীতীর সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে। বাংলাদেশে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগে এই ৭০০ মিটার নদীতীরের দ্রুত আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।

জেএইচআর