মানুষ আজ সভ্যতার উন্নত শিখরে আরোহণ করলেও সমাজের অনেকেই এখনও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। যেখানে এই জনগোষ্ঠীর অনেককে জীবনযাত্রার তাগিদে নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা যায়, সেখানে টাঙ্গাইলের মধুপুরে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন মোহাম্মদ রাসেল তালুকদার ওরফে ‘প্রেমা’। তিনি ঝরে পড়া ও পথশিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে গড়ে তুলেছেন ‘স্বপ্নজয়ী পাঠশালা’ নামের একটি ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়।
মঙ্গলবার দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার মধুপুর প্রতিনিধি সরেজমিনে প্রেমার সেই পাঠশালাটি পরিদর্শন করেন। মধুপুর পৌরসভার প্রত্যন্ত চাড়ালজানী টেকিপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরগতিতে হলেও একদল সুবিধাবঞ্চিত শিশুর স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে চলছে।
বর্তমানে শিক্ষিকা মোসাম্মৎ শিরিন আক্তারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত মনমুগ্ধকর পরিবেশে শিশুরা এখানে পড়াশোনা করছে। শিক্ষিকা শিরিন আক্তার বলেন, “অত্র প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্লে শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করানো হচ্ছে। সরকার এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে আগামী বছর থেকে আমরা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান চালু করতে চাই।”
বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র নীরব বলে, আমি ঝরে পড়া এক শিক্ষার্থী, আমার কোনো অভিভাবক নেই। আগে এলাকায় ঘুরে বেড়াতাম। প্রেমা আপা আমাকে ডেকে এনে এই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। আমার খাতা, কলম থেকে শুরু করে স্কুলের পোশাক পর্যন্ত সব তিনিই দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদ রাসেল তালুকদার ওরফে প্রেমা টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার চৈথট্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান। হিজড়া হওয়ায় একপর্যায়ে পরিবার থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি পড়াশোনা থামাননি। তিনি মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণী এবং পাকুটিয়া আশ্রম স্কুল থেকে ১৯৯৮ সালে এসএসসি পাস করেন।
একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রেমা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, সমাজ আমাদের ঘৃণা করে। আমরা সমাজকে কিছু উপহার দিতে পারি না বলেই পেটের দায়ে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। কিন্তু আমাদের এই অবস্থার জন্য তো আমরা দায়ী নই, এটা মহান আল্লাহর সৃষ্টি। এই অবহেলা থেকে মুক্তি পেতে এবং সমাজকে ভালো কিছু উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে গত ১২ জানুয়ারি ২০২২ সালে আমি এবং আমার দুই বন্ধু প্রীতি ও শিল্পী মিলে ‘স্বপ্নজয়ী পাঠশালা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই।
তিনি আরও জানান, শুধু এই পাঠশালাটিই নয়, তাঁর নিজ গ্রামে একটি নূরানী মাদ্রাসাও গড়ে তুলেছেন তিনি, যার হুজুরদের বেতনও তিনি নিজে বহন করেন। এই দুটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন