কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন ফসলি জমি, রাস্তার পাশ ও পতিত ভূমিতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে বিষাক্ত আগাছা ‘পার্থেনিয়াম’। দেখতে অনেকটা ধনিয়া গাছের মতো হলেও এই আগ্রাসী আগাছাটি স্থানীয় কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ, গবাদিপশু এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই বিষাক্ত আগাছা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত চার থেকে পাঁচ বছরে উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নেই পার্থেনিয়ামের বিস্তার চোখ পড়ার মতো বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা, সড়কের দুই পাশ, পতিত জমি এবং ফসলের মাঠের আশপাশে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, স্থানীয় অধিকাংশ মানুষ এখনো এই আগাছাটির ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নন।
উদ্ভিদবিদদের মতে, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার এই আক্রমণাত্মক আগাছা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হয়। গাছটির জীবনকাল মাত্র তিন থেকে চার মাস হলেও এই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একাধিকবার ফুল ও বীজ উৎপাদন করে। একটি গাছ থেকেই তৈরি হয় হাজার হাজার বীজ, যা বাতাস, যানবাহন, মানুষ ও পশুপাখির মাধ্যমে দ্রুত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে ছায়াযুক্ত কিংবা দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে এমন স্থানে সাধারণত এই আগাছা জন্মায় না।
মাঠে কাজ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী হোগলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, আগে এই আগাছা খুব একটা দেখা যেত না। এখন জমির চারপাশেই ছড়িয়ে পড়েছে। শরীরে বা ঘামযুক্ত ত্বকে লাগলেই প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হয়। কেটে ফেললেও কিছুদিন পর আবার গজিয়ে ওঠে।
একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে আরেক কৃষক জামিরুল ইসলাম বলেন, জমির চারপাশে এটি এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে গরু-ছাগলও অনেক সময় ভুলে খেয়ে ফেলছে। কোনো কীটনাশকেও তেমন কাজ হচ্ছে না। দ্রুত এর একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
পার্থেনিয়ামের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, “পার্থেনিয়ামের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে অ্যালার্জি, চুলকানি, চর্মরোগ, চোখে জ্বালাপোড়া ও শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই জমিতে কাজ করার সময় কৃষকদের গ্লাভস, মাস্ক ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা উচিত।”
গবাদিপশুর ক্ষতির বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানান, গবাদিপশু এই আগাছা খেলে হজমের সমস্যা, জ্বর, দুর্বলতাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে দুগ্ধবতী গাভির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক আহসান কবির রানা বলেন, পার্থেনিয়ামের পাতা, ফুল ও বীজ সব অংশই বিষাক্ত। এর পরাগরেণু বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই ফুল ফোটার আগেই গাছ উপড়ে নিরাপদে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। এই আগাছা নিয়ন্ত্রণে সরকার, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফারিহা তানজুম স্বর্ণা বলেন, পার্থেনিয়াম মাটির সব পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নেয়, যার ফলে আশপাশের ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এর কারণে ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় পার্থেনিয়ামকে বিষাক্ত আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এটি দমনের জন্য এখনো কার্যকর কোনো নির্দিষ্ট কীটনাশক বাজারে আসেনি। আমরা কৃষকদের নিয়মিত সচেতন করার চেষ্টা করছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম নিয়ন্ত্রণের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো ফুল ও বীজ ধরার আগেই গাছ উপড়ে নিরাপদে ধ্বংস করা। তবে আগাছা অপসারণের সময় অবশ্যই গ্লাভস, মাস্ক ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা না গেলে এই বিষাক্ত আগাছার বিস্তার রোধ করা কঠিন হবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন