সুন্দরবনে দস্যুমুক্তির নতুন দিগন্ত

অস্ত্রসহ ‘বড় জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর ৩ দস্যুর আত্মসমর্পণ, জিম্মি জেলে উদ্ধার

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি  প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
অস্ত্রসহ ‘বড় জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর ৩ দস্যুর আত্মসমর্পণ, জিম্মি জেলে উদ্ধার

সুন্দরবনের গহীন অরণ্য ও উপকূলীয় নদীপথে ত্রাস সৃষ্টিকারী কুখ্যাত 'বড় জাহাঙ্গীর' বাহিনীর তিন সক্রিয় সদস্য অবশেষে অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ক্রমাগত চাপ এবং সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কোণঠাসা হয়ে তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছেন। একই সঙ্গে তাদের ডেরা থেকে গত ১৫ দিন ধরে বন্দি থাকা এক ভাগ্যহত জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে বাগেরহাটের মোংলায় অবস্থিত কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তরে এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মোংলা বেইজে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে দস্যুরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অস্ত্র তুলে দেন। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলামের কাছে তারা তাদের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র হস্তান্তর করেন।

জমাকৃত সমরাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দুটি, দেশীয় একনলা বন্দুক একটি, দেশীয় পাইপগান ও ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ। 

দস্যুদের এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কোস্ট গার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের মনোনীত প্রতিনিধি এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এই প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন উপস্থিত সকলেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণকারী এই তিন দস্যু সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম ছিলেন। 

তাদের পরিচয় হলো বাগেরহাট জেলার মোংলা থানা এলাকার আলামিন হোসেন (৪০), সাতক্ষীরা জেলার তালা থানা এলাকার তৈবুর রহমান (২৪) ও খুলনা জেলার কয়রা থানা এলাকার মনিরুজ্জামান মামুন (২০)। 

দীর্ঘদিন ধরে তারা ‘বড় জাহাঙ্গীর’ নামক কুখ্যাত দস্যু দলটির সাথে সম্পৃক্ত থেকে সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালি (গোলপাতা সংগ্রহকারী) এবং মৌয়ালদের অপহরণ করে আসছিলেন। সাধারণ মেহনতি মানুষদের জিম্মি করে লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। কিন্তু কোস্ট গার্ডের কঠোর অবস্থানের কারণে অবরুদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত করতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি বিশেষ মেগা-অপারেশন চালানো হচ্ছে।

এই দুই অভিযানের আওতায় সুন্দরবনের প্রতিটি রুট ও নদ-নদীতে কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক টহল ও আকস্মিক অভিযানের ফলে দস্যু বাহিনীগুলো তাদের নেটওয়ার্ক সচল রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। রসদ ও যোগাযোগের অভাব এবং কোস্ট গার্ডের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে ‘বড় জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর এই তিন সদস্য মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং আত্মরক্ষার্থে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন।

কোস্ট গার্ডের বিসিজিএস কামরুজ্জামানের নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মো. মানসুর মাহদীন এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে জানান, সুন্দরবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাদের এই আপসহীন অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সুন্দরবনে দস্যুদের আত্মসমর্পণের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত ২১ মে সুন্দরবনের আরেকটি ত্রাস সৃষ্টিকারী দল 'ছোট সুমন' বাহিনীর প্রধানসহ ৭ সদস্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। একের পর এক শীর্ষ দস্যু বাহিনীর এই পতন উপকূলীয় অঞ্চলের অপরাধ দমনে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মেসবাউল ইসলাম সুন্দরবনের অন্যান্য সক্রিয় অপরাধী ও ডাকাত দলগুলোর উদ্দেশ্যে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, যারা এখনো সুন্দরবনে দস্যুবৃত্তি ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার মতো অপরাধের সাথে যুক্ত আছেন, তারা অনতিবিলম্বে এই পথ পরিহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন। যারা আত্মসমর্পণ করবেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু যারা এই আহ্বান উপেক্ষা করে অপরাধ অব্যাহত রাখবেন, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে চরম ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারী তিন দস্যুর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের কাজ শুরু হয়েছে। জব্দকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ মোংলা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি, উদ্ধার হওয়া জেলেকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে আশার কথা হলো, অপরাধের পথ ছেড়ে দেওয়া এই যুবকদের সমাজমুখী করতে এবং তারা যাতে আবার অপরাধে জড়িয়ে না পড়েন, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনের বুক থেকে চিরতরে দস্যুতার অবসান ঘটবে এবং উপকূলীয় অর্থনীতি আরও বেগবান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এএন