মাগুরায় ৬০ কোটি টাকার চালক বিশ্রামাগার এখন মাদকসেবীদের দখলে

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
মাগুরায় ৬০ কোটি টাকার চালক বিশ্রামাগার এখন মাদকসেবীদের দখলে

মাগুরা রামনগর হাইওয়ে মহাসড়কের পাশে প্রায় ৬০ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক চালক বিশ্রামাগার ও ট্রাক টার্মিনালটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত। চালকদের নিরাপদ বিশ্রাম, ট্রাক পার্কিং এবং মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে নির্মিত এই অবকাঠামো আজ আগাছায় ঢেকে গেছে। সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা ডুবে যায় অন্ধকারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি এখন মাদকসেবী, বখাটে এবং অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িতদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ট্রাক পার্কিং ইয়ার্ড ফাঁকা পড়ে আছে। বহুতল বিশ্রামাগার ভবনের দরজা-জানালা বন্ধ এবং চারপাশে ঝোপঝাড় গজিয়েছে। পাশেই একটি অসম্পূর্ণ ভবনের কংক্রিট কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে নির্মাণকাজের ধীরগতির নীরব সাক্ষী হয়ে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকা ভুতুড়ে পরিবেশ ধারণ করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় নির্জন আর রাতের বেলায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে এই প্রকল্প।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় দেশের চারটি মহাসড়কে আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল ও চালক বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে মাগুরায় নির্মিত হয় ৬৭টি ট্রাক পার্কিং সুবিধা এবং ৫২ শয্যার আধুনিক চালক বিশ্রামাগার। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব নির্ধারণ না হওয়ায় প্রকল্পটি চালু করা যায়নি।

মাগুরা জেলায় প্রতিদিন ৪৫০-এর বেশি ট্রাক চলাচল করে। অথচ তাদের জন্য নির্মিত পার্কিং সুবিধা ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে চালকেরা বাধ্য হয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের পাশে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখছেন। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মিত ট্রাক টার্মিনাল চালু না হওয়ায় একদিকে সরকারি বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তার লক্ষ্যটিও অর্জিত হয়নি।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ৬.৫৭৭ একর জমির ওপর বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ২৩ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ৮৬১ টাকা। অন্যদিকে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির আর্থিক আকার দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটিরও বেশি। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ১ জুলাই এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এটি পুরোপুরি চালু হয়নি। নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে এনডিই লিমিটেড, হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড এবং মেসার্স সাগর বিল্ডার্স জেভি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি ভবনের কাজ সম্পন্ন হলেও পাশের আরেকটি ভবনের নির্মাণকাজ এখনও অসমাপ্ত। বিশাল অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, যদি প্রকল্পটি চালুই না হয়, তাহলে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল জনগণ কোথায় পেল? তাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি, বিল পরিশোধ এবং পরিচালন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

মাগুরা ট্রাক মালিক-শ্রমিক নেতা রেন্টু বলেন, মাগুরায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি আধুনিক ট্রাক টার্মিনালের প্রয়োজন ছিল। এই টার্মিনাল চালু হলে মহাসড়কে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখতে হতো না, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমত। কিন্তু এত টাকা খরচ করে নির্মাণের পরও এটি চালু না হওয়া দুঃখজনক।

এই বিষয়ে জানতে মাগুরা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেলের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জেএইচআর