প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান বলেছেন, যতদিন জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা বিএনপির সাথে থাকবে, ততদিন দেশের সার্বিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের পথে কোনো বাঁধাই টিকে থাকতে পারবে না। তিনি জনগণকে বিএনপির সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, আমরা এই দেশটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই। আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। জনগণকে পাশে নিয়ে, ইনশাআল্লাহ, আমরা এই দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাব।
আজ সকালে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর এলাকায় 'ফ্যামিলি কার্ড' (পারিবারিক কার্ড) সুবিধাভোগী নারীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তৃণমূলের নারীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কথা: মতবিনিময় সভার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত সাধারণ নারীদের সাথে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজন নারীর কাছে যান এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কি ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন? এই কার্ড আপনাদের জীবনে কী ধরনের সুবিধা বা পরিবর্তন এনেছে?
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত নারীদের মধ্যে অন্যতম সুবিধাভোগী পারুল আক্তার অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে মঞ্চে এসে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এই ফ্যামিলি কার্ডটি পাওয়ার পর আমার এবং আমার পরিবারের অনেক বড় উপকার হয়েছে। আমাদের সংসারের আর্থিক অনটন ও কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। আমি আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও আমাদের পাশে থাকবেন এবং আমাদের সুখে-দুঃখে এভাবেই সহযোগিতা করে যাবেন।
নারীদের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গৌরনদীর এই বাটাজোর এলাকায় প্রায় ৬০০টি পরিবারকে এই কার্ড প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি জানি, এখানে আরও অনেক পরিবার রয়েছে যারা এখনও এই সুবিধা পায়নি। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, যারা বাকি আছেন, ইনশাআল্লাহ, তারাও খুব দ্রুতই এই ফ্যামিলি কার্ড পেয়ে যাবেন।
চার কোটি পরিবারে পৌঁছানোর মহাপরিকল্পনা: দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের বড় উদ্যোগ এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। এই প্রকল্পের আওতা বৃদ্ধি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সমগ্র বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের হাতে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আমরা ধাপে ধাপে দেশের সকল চার কোটি পরিবারের নারী প্রধানদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে এই কার্ডের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাদের সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে।
তিনি আরও বলেন, মা ও বোনদের মুখ থেকে যখন শোনেন যে এই কার্ডের ফলে তাদের সংসার চালানো কিছুটা সহজ হয়েছে, তখনই সরকারের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়। নারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই এই রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
নারীদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক রূপান্তর: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, ফ্যামিলি কার্ডের এই কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি সাময়িক আর্থিক সহায়তার প্রকল্প নয়, বরং এটি সমাজ পরিবর্তনের একটি অন্যতম হাতিয়ার।
তিনি দেশের সকল স্তরের নারীদের বর্তমান সরকারের পাশে দাঁড়ানোর এবং সহযোগিতা করার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যদি বাংলাদেশের নারী সমাজ বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগের পাশে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ, আমরা পর্যায়ক্রমে সমগ্র দেশজুড়ে এই কর্মসূচির বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হব।
সরকারপ্রধান দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সামাজিক রূপান্তর, ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। শিক্ষার আলো, পরিবারের নারীরা যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন, তখন তা তাদের সন্তানদের শিক্ষার পথকে আরও সুগম করবে এবং নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক মুক্তি, তৃণমূলের নারীদের সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করাই এই কার্ডের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, বর্তমান সরকার দেশের সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, আমরা চাই এ দেশের প্রতিটি মানুষ, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, সবাই যেন একসাথে শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করতে পারে। আমরা যদি সবাই ধৈর্য ধারণ করি এবং সহনশীলতার সাথে কাজ করি, তবে আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
সহিংসতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান আমরা যে ধর্মেরই হই না কেন, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো একসাথে মিলেমিশে থাকা। ধর্ম যার যার, কিন্তু এই রাষ্ট্র সবার। তাই বর্তমান ও ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই, শুধুমাত্র মানবিকতার ভিত্তিতে সবাইকে সাথে নিয়ে এই দেশ পুনর্গঠন করা হবে।
‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ নতুন রাজনৈতিক দর্শন: বক্তব্যের শেষ অংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমান সরকারের মূল রাজনৈতিক স্লোগান ও দর্শনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণত বলা হয়ে থাকে ‘আসুন দেশ গড়ি, বাংলাদেশ প্রথম’ (Bangladesh First)। কিন্তু আজ সেই স্লোগানের সাথে তিনি আরেকটি নতুন লাইন যুক্ত করতে চান, আসুন দেশ গড়ি একটি সবার জন্য বাংলাদেশ।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকারের মূল রাজনীতি হলো বৈষম্যহীনতা। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক যেন উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন জীবনযাপন করতে পারেন, সেটিই বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য এবং একমাত্র উদ্দেশ্য।
উক্ত মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
বরিশালে পরবর্তী কর্মসূচি, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ: গৌরনদীর বাটাজোরে ফ্যামিলি কার্ড সুবিধাভোগী নারীদের সাথে সফল মতবিনিময় সভা শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সড়কপথে বরিশাল মহানগরীর উদ্দেশ্যে রওনা হন।
প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বরিশাল শহরে পৌঁছানোর পর তাঁর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকার ঐতিহ্যবাহী সাগরদী খালের পাড়ে এবং ত্রিশ গোডাউন সংলগ্ন বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের পাশে একটি বিশেষ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। পরিবেশ রক্ষা এবং দেশের গ্রিন ইকোনমি (সবুজ অর্থনীতি) জোরদার করার অংশ হিসেবে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সমগ্র বরিশাল জুড়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন