প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদ থেকে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদ থেকে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা
পুলিশ কনস্টেবল সাইদুল ইসলাম

পরিবারের অমতে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই সংসার টিকেছিল মাত্র দেড় মাস। বিচ্ছেদের মানসিক আঘাত সইতে না পেরে রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্সে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে কনস্টেবল সাইদুল ইসলাম (২১)-এর মরদেহ। তার মৃত্যুর খবরে ফেনীর গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আহাজারিতে ভেঙে পড়েছেন মা।

নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের ছেলে। প্রায় নয় মাস আগে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন তিনি। কর্মরত ছিলেন রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্সে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ত্রীর উদ্দেশে একটি দীর্ঘ আবেগঘন পোস্ট লিখেছিলেন সাইদুল। পরে পুলিশ লাইন্সের বহুতল ভবন থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছেলের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর উত্তর চাঁদপুর গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সন্তানের শোকে বারবার ভেঙে পড়ছেন তার মা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মাগরিবের নামাজের পরও আমার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভালোবেসে পরিবারের অমতে গিয়ে যে বিয়ে করেছিল, সেই বিয়েই আমার ছেলের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল।”

সাইদুলের চাচা মো. সোহাগ জানান, প্রেমের সম্পর্কের পর ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন সাইদুল। তবে বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক নানা বিরোধ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে তাদের বিচ্ছেদ হয়। মাত্র দেড় মাসের সংসার ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি তিনি মানতে পারেননি। বিচ্ছেদের পর থেকে তিনি গভীর মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে পরিবারের সদস্যদের ধারণা।

স্থানীয় বাসিন্দা এম. এমরান পাটোয়ারী জানান, ডেমরা পুলিশ লাইন্স থেকে ফোন করে পরিবারের সদস্যদের সাইদুলের মৃত্যুর খবর জানানো হয়। পরে শুক্রবার বিকেলে নিহতের বাবা মো. সাদেক ডেমরা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন।

ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, ডেমরায় সাইদুল ইসলাম নামে এক পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন বলে লোকজনের মুখে শুনেছি। তার বাড়ি ফেনীতে। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা পুলিশ লাইন্সের নিজ কক্ষে ফাঁস দেন সাইদুল। পরে সহকর্মীরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আত্মহত্যার প্রায় ১৬ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ত্রীর সঙ্গে পুরোনো কিছু ছবি ও ভিডিও সংযুক্ত করে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন সাইদুল। সেখানে বৈবাহিক জীবনের তীব্র মানসিক কষ্ট, হতাশা ও স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন তিনি।

ফেসবুক পোস্টে সাইদুল লিখেছিলেন- ‘তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুদিনেই চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে... সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কূলের দেখা না পেয়ে শেষমেষ নিয়তিকে মেনে নেয়, সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।’

সম্পর্কের ইতি টানা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও লেখেন, ‘তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ? নাকি সবকিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ? তুমি না বলছিলা, মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না? এখন কই তুমি?’

স্ত্রীকে বারবার সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না যে বিশ্বাস করলে নিজেরই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।’

পোস্টের শেষ অংশে নিজের বাবা-মায়ের প্রতি ক্ষমা চেয়ে অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে তিনি লেখেন- ‘দুঃখিত আম্মু-আব্বু, আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেছে না আম্মু, আর পারতেছে না। আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাফ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে।’

এএন