রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার ৫ নম্বর কাউনিয়া বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভী বাজার এলাকায় গেলে দেখা মিলবে একটি পাকা সেতুর। কিন্তু সেতু থাকলেও দুই পাশে কোনো সংযোগ সড়ক না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন এলাকাবাসী। সেতুর দুই পাড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ যাতায়াত করছেন।
জরাজীর্ণ সেতুটি এখন স্থানীয় হাজারো মানুষের জন্য এক জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুটির একটি অংশ একপাশে মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে। এছাড়া মূল কাঠামোর দুই পাশের সংযোগস্থল ধসে যাওয়ায় সেখানে অস্থায়ীভাবে কাঠের পাটাতন বসিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নড়বড়ে এই কাঠের ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সেতুটি ধসে পড়ে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভী বাজার এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় বাধ্য হয়েই আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ব্যবহার করছেন এলাকাবাসী।
বর্তমানে সেতুটির একপাশ দেবে গিয়ে পুরো কাঠামো ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটির এমন বেহাল অবস্থার কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কৃষকরা নিরাপদে তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারছেন না, ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। রাতের বেলায় সেতুটি দিয়ে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনের বর্তমান স্থানীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও কোনো ফল হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পাকা সেতুটির দুই পাশে কোনো রাস্তা নেই। সেতুটির একপাশ হেলে গিয়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যে কোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়তে পারে। এলাকাবাসী সেতুর দুই পাড়ে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে ইউএসএআইডি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে, কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় এবং এলজিইডির বাস্তবায়নে ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ১৮৩ টাকা ব্যয়ে পাকা সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সালের জুন মাসে সেতুটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মায়া। সেতু নির্মাণের পর দুই বছর এলাকার কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের সুবিধা বাড়ে। এরপর প্রতিবছর বন্যায় তিস্তার পানির তোড়ে সেতুটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও সংযোগ সড়ক মেরামত না হওয়ায় পথচারী ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে যাতায়াতে ১০ গ্রামের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় সেতুর দুই পাড়ে সাঁকো তৈরি করা হলেও সেটিও এখন বেহাল অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় মোহাম্মদ আলী জানান, প্রতিবছর সেতুর দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, আর জনগণের দুর্ভোগ আমাদের এলাকার এমপিরা দেখেন না।
স্থানীয় মাদরাসার ছাত্র নাবিল জানায়, চরের শিক্ষার্থীদের সমস্যার খবর কেউ রাখে না।
কৃষক আলিম উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন সেতুটির সংযোগ সড়ক মেরামত না হওয়ায় আমরা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না।
ইউপি সদস্য হাফিজার রহমান জানান, সমস্যাটি সমাধানে চেয়ারম্যান সাহেবকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু পরিষদের পক্ষে এত বড় সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইউপি চেয়ারম্যান আনছার আলী জানান, গত বছর মাটি কেটে ভরাট করেছি, আবারও বন্যায় ভেঙে গেছে। নড়বড়ে পাকা সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রকৌশল দপ্তরে ৪ থেকে ৫ বার আবেদন করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে কাউনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌলভী বাজার এলাকার সেতুটি নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদনও হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি ও টপোগ্রাফিক (টোপো) সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে এটি ডিজাইন পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই টেন্ডারের অনুমোদন হবে। এরপরই নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।
এলাকাবাসী বলেন, উন্নয়নের মহাসড়কে সেতু আছে, সড়ক নেই। এমপি, মন্ত্রী এবং আমলারা দেখেন না বলেই হয়তো কাজ হচ্ছে না। ১০ গ্রামের মানুষের দাবি, সেতুটি নতুন করে নির্মাণ করে চরের মানুষের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা হোক। এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নতুন সেতু নির্মাণে কাউনিয়া উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বালাপাড়া ইউনিয়নের মৌলভী বাজার এলাকার সর্বস্তরের জনগণ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন