যশোরে হালকা প্রকৌশল পণ্য উৎপাদনে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। আমদানিনির্ভর এসব পণ্য যশোরেই উৎপাদিত হয়ে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ই করছে না, আহরণও করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই শিল্পের বিকাশে নানা অন্তরায় থাকলেও সম্প্রতি যশোরে সরকারি শিল্প সহায়ক কেন্দ্র বিটাকের একটি অফিস স্থাপনের ঘোষণায় এই শিল্পের মালিকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
গাড়ির পার্টস, স্প্রিংপাতি ও বডি, ডাকটাইল স্টিল, ইলিশ মাছ ধরার ট্রলারের পাখা, পাথর ও ইটভাঙা মেশিন এমনকি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ডের ট্রাক বোর্ডের মালামাল ও ক্রেনের ৮শ’ থেকে ৯শ’ কেজি ওজনের হুইল—এসব কিছুই এখন যশোরে উৎপাদিত হচ্ছে। এর সবই আগে আমদানিনির্ভর ছিল। এখানে উৎপাদিত গাড়ির পার্টস ব্যবহার করছেন দেশের প্রতিষ্ঠিত পরিবহন ও স্থানীয় রুটের গাড়ি ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে ইট ও পাথরভাঙা মেশিন ভারতে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন উদ্যোক্তারা। শুধুমাত্র ইট ও পাথরভাঙা মেশিনের বাজার হাজার কোটি টাকা বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
১৯৯২ সালে মাত্র ১২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে যশোর শহরে রিপন মেশিনারিজ নামে কৃষি পার্টসের ব্যবসা শুরু করেন আশরাফুল ইসলাম বাবু। এরপর ব্যবসা ভালো হলে ১৯৯৫ সালে রিপন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন হচ্ছে স্টোন মিনি ক্রাশার, ইটভাঙা, পাথরভাঙা মেশিন, ইস্পলার, প্রেসার পুলি, লাইনার স্লট প্লেট, পানির পাম্প, স্যালো ইঞ্জিনের মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ। এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ইট ও পাথরভাঙা মেশিন দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। অতিসম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে ভারতে পানির পাম্প পাঠানো হয়েছে। এই পাম্পেরও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। দেশে একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানেই তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়ক কেন্দ্র (বিটাক)-এর সিলিন্ডার ব্লক। এখান থেকে ঢালাই করে নিয়ে এই ব্লক ঢাকার সরকারি কারখানায় কাটা হয়।
যশোর লাইট অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি ও রিপন মেশিনারিজের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল ইসলাম বাবু জানান, প্রতিমাসে তাদের উৎপাদিত ১৫ থেকে ২০টি পাথরভাঙা মেশিন ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে। যার প্রতিটি মেশিনের দাম সাড়ে চার লাখ টাকা। আর সারাদেশের বাজারে তাদের ইট ও পাথরভাঙা মেশিনের বাজারও ভালো। সবসময় ৩০ থেকে ৩৫টি মেশিনের অর্ডার থাকে তার।
শুধু রিপন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ না, যশোরে অন্তত ৩০০ হালকা ও ভারি প্রকৌশল শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের পণ্য সারাদেশে ব্যবহার হচ্ছে। যশোরের গাড়ির পার্টস উৎপাদনকারীদের মধ্যে অন্যতম এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা। এর স্বত্বাধিকারী মো. আক্তার হোসেন ১৯৮০ সালে নিজেই মটরপার্টস তৈরি করতেন। তার আগে রিপিয়ারিং-এর কাজ করতেন। ২০১১ সালে বিসিক শিল্পনগরীতে একবিঘা জমির ওপর কারখানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এখানে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শতাধিক গাড়ির পার্টস উৎপাদিত হয় এখানে। যার মধ্যে গাড়ির ব্রেকড্রাম, পেসারপ্লেট, গিয়ারবক্স, ব্রেকডিস্ক, ইঞ্জিন হাউজিং, হ্যাঙ্গার, গিয়ার বক্সের বডি অন্যতম। এছাড়া জুট, রাইস ও সিমেন্ট মিলের পার্টসও এ কারখানায় উৎপাদিত হয়। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা দাম এসব পার্টসের। এখানকার সবধরনের গাড়ির ড্রাম যাচ্ছে সারাদেশে। স্বনামধন্য পরিবহন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় রুটের গাড়ির মালিকরা এসব পার্টস ব্যবহার করছেন।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান জানান, যশোরের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক আগে থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ভালোমানের। তবে তাদের আরো বিকশিত হতে হলে আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। কেননা উৎপাদিত পণ্যের পরিচিতি না থাকলে তা খুব বেশি এগুবে না। আর ব্যাংকগুলোকে ভালো প্রতিষ্ঠানে এসএমই ঋণ দিতে হবে।
এআরএস
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন