বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য

‘স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন হতে পারে’

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২৩, ০৮:৩২ পিএম
‘স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন হতে পারে’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ কাজে লাগিয়ে একক কিংবা যৌথ বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারে ভারত। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় দুদেশের বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রায় করা যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) ঢাকা চেম্বার এবং ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে আয়োজিত ‘ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ড. মসিউর রহমান বলেন, দুদেশের রেল যোগাযোগ উন্নয়নে যমুনা রেল সেতু স্থাপন সহ বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে সহজতর করবে। তিনি ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পাশাপাশি অন্যান্য প্রদেশে বিনিয়োগ ও পণ্য রপ্তানিতে মনোযোগী হওয়ার জন্য বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ হতে কাঁচা পাট রপ্তানিতে আরোপিত এন্টি-ডাম্পিং ডিউটির ফলে আমাদের স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হচ্ছেন, যা নিরসনে ভারত সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট প্রক্রিয়া আরো সহজীকরণের উপর জোরারোপ করেন ড. মসিউর রহমান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মো. সামীর সাত্তার বলেন, ২০২২ অর্থবছরে দুদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং শুল্ক বর্হিভূত যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে দুদেশের বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় আয় যথাক্রমে ১৭ শতাংশ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। দুটো দেশের রয়েছে পৃথিবীর ৫ম বৃহত্তম সীমান্ত, এমতাবস্থায় সীমান্ত এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রম স¤প্রসারিত হলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যারিস্টার সাত্তার বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের যোগাযোগের উন্নয়নে দুদেশের আঞ্চলিক বাজার ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ভারতীয় উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এগ্রো-প্রসেসিং, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল, তথ্য-প্রযুক্তি ও সেবা প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তিনি জানান, গত এক দশকে দুদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং প্রস্তাবিত ‘সেপা’ চুক্তির বাস্তাবয়ন হলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থায় আরো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হবে।

হাইকমিশনার বলেন, বর্তমানে ৭টি ‘ল্যান্ড কাস্টমস্ স্টেশন’ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৭টি স্থানে ‘বর্ডার-হাট’ পরিচালনার মাধ্যম স্থানীয় উদ্যোক্তাবৃন্দ সহজেই পণ্য রপ্তানিতে সক্ষম হয়েছেন এবং সামনের দিনগুলোতে বর্ডার হাট কার্যক্রম আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা অন্যান্য দেশে পণ্য রপ্তানিতে কলকাতা ও দিল্লী বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে।     

সেমিনারে বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তাঁরা বলেন, দুদেশের মোট বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ হয়ে থাকে স্থলবন্দরের মাধ্যমে এবং এক্ষেত্রে বেনাপল-পেট্রোপল বন্দরের ব্যবহারের হার প্রায় ৭০ শতাংশ।

মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, গত ৫ বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত ৩ বছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্বিগুন হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এছাড়াও বাংলাদেশের রেলওয়ে খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভারত সরকার বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার সুফল শ্রীঘ্রই কাজে আসবে। সেই সাথে বলা হয়, প্রস্তাবিত ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ পাইপলাইন’ এর কার্যক্রম চালু হলে প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়ন টন ডিজেল পরিবহন সক্ষম হবে।  যেটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মুক্ত আলোচনায় প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান, ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মতিউর রহমান, আসিফ ইব্রাহীম, মোঃ সবুর খান, শামস মাহমুদ, এমসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি আনিস উদ-দৌলা, ঢাকা চেম্বারের পরিচালক মালিক তালহা ইসমাইল বারী, খায়রুল মজিদ মাহমুদ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত ‘কম্পেহেনসিভ প্রিফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (সেপা)’ চুক্তির বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কাঁচা পাট রপ্তানির উপরযোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের অধিকতর উন্নয়ন সম্ভব।

এআরএস