ঢাকার পুঁজিবাজারে আবারও বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর দৈনিক গড় লেনদেন, বাজারমূলধন এবং প্রধান সূচক-সবকিছু নেমে এসেছে সর্বনিম্ন অবস্থানে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে লেনদেন ও সূচকে।
সপ্তাহজুড়ে বাজারের লেনদেনে টানা দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে। ২১টি খাতের মধ্যে মাত্র দুটি-সিমেন্ট ও টেলিযোগাযোগ-পতনের বাইরে থাকতে পেরেছে। বাকিগুলোতে লেনদেন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত এবং তাদের শেয়ার লেনদেন স্থগিত থাকার প্রভাব বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। ব্রোকারেজ হাউজগুলো বলছে, যে বিনিয়োগকারীরা এই ব্যাংকগুলোর শেয়ার ধরে রেখেছেন, নতুন কাঠামোতে তাদের শেয়ার কীভাবে রূপান্তরিত হবে এ প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই। এই অনিশ্চয়তাই আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
লেনদেন স্থগিত থাকা শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প সুবিধা পাবেন-নির্ধারক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় আস্থা আরও কমছে বলে জানাচ্ছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
গত সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে মোট লেনদেন নেমে আসে ৩০০ কোটি টাকার নিচে যা ২৩ জুনের পর আর দেখা যায়নি। এর পাশাপাশি সপ্তাহজুড়ে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল মাত্র ৩৫৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
লেনদেন কমার সঙ্গে সঙ্গে বাজার মূলধন থেকেও উধাও হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। শুধু এক সপ্তাহেই বাজার হারিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা।
প্রধান সূচক ডিএসই-এক্স সপ্তাহের ব্যবধানে ২৬৫ দশমিক ২৫ পয়েন্ট হারিয়ে নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭০৩ পয়েন্টের নিচে-এটিও ২৩ জুনের পর সর্বনিম্ন অবস্থান। সূচক পতনকে বাজারের ওপর আস্থাহীনতার সরাসরি প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর একীভূত হওয়ার পর শেয়ারধারীদের ভবিষ্যৎ কী হবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। দাম পড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো এই অনিশ্চয়তা।
পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটির সদস্য আল আমিন মনে করেন, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় মনোভাব দৃশ্যমান হলে বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) জানায়, গত সপ্তাহে প্রতিদিনই বেড়েছে শেয়ারশূন্য বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা-যা ইঙ্গিত করে অনেক বিনিয়োগকারী সম্পূর্ণভাবে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন অথবা বিক্রি করেও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারকদের ধীর সিদ্ধান্ত, আর্থিক খাতে অব্যাহত অনিয়ম, আর এসব মিলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
তাদের মতে, বাজারের আর্থিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে সূচক বা লেনদেনে স্থায়ী উন্নতি আসবে না।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন